❐ নিজস্ব প্রতিনিধি
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) কোতোয়ালি থানায় সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. রাকিবুজ্জামানকে মারধর ও শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগের ঘটনায় ৬ জন উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) ও সহকারী উপ-পুলিশ পরিদর্শক (এএসআই)সহ মোট ১১ জন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
গতকাল ১১ই জুন, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) হাবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে কর্তব্যে অবহেলা, অপেশাদার আচরণ এবং অসদাচরণের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন—এসআই মাসুদ রানা, এসআই আলম বাদশা, এসআই আক্তারুল ইসলাম, এএসআই মনিরুল ইসলাম, এএসআই আরিফুল ইসলাম, এএসআই মেহেরুন্নেসা এবং কনস্টেবল মুশফিকুর রহমান, মুখলেসুর রহমান, রাকিব আহমেদ, লিমা সরেন ও ভাবনা রানী।
ঘটনার পর গত ৩রা জুন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার নরেশ চাকমাকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তদন্ত কমিটি অভিযোগপত্র, সংশ্লিষ্ট নথি, সাক্ষ্য-প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং কোতোয়ালি থানার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মো. রাকিবুজ্জামান রাকিব, সিরাজুম মুনিরা মৌফি এবং রুমন বাবুকে ঘিরে সংঘটিত ঘটনায় কয়েকজন পুলিশ সদস্যের কর্তব্য পালনে ইচ্ছাকৃত অবহেলা, অদক্ষতা, অপেশাদার আচরণ এবং অসদাচরণের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অভিযুক্ত সদস্যদের আচরণের কারণে ভুক্তভোগীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, কোরবানির ঈদের আগে রংপুর নগরের সিও বাজার এলাকার এক প্রেমিক-প্রেমিকা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। পরে ওই যুগলকে উদ্ধার করে ৩রা জুন সন্ধ্যায় থানায় নিয়ে আসা হয়।
পরিবারের অনুরোধে বিষয়টি সামাজিকভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতা থানায় উপস্থিত হন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা লাভলুর আহ্বানে সেখানে যান সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব রাকিবুজ্জামানও।
রাকিবুজ্জামানের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি রাত সাড়ে ৯টার দিকে থানায় গিয়ে দেখতে পান, এক পুলিশ সদস্য ওই যুগলকে মারধর করছেন। তিনি এর প্রতিবাদ করলে তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাদ রহমানসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য তার ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে তাকেও মারধর করা হয়, যাতে তিনি গুরুতরভাবে আহত ও রক্তাক্ত হন।
ঘটনার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলে প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়।
প্রথম পর্যায়ে তৎকালীন ওসি আজাদ রহমানসহ ছয়জন পুলিশ কর্মকর্তাকে কোতোয়ালি থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ওসি আজাদ রহমানকে খুলনা রেঞ্জে বদলি করা হয়।
এ বিষয়ে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচরণ কিংবা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে আরপিএমপি ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করে।
তিনি বলেন, কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হয় এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১১ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে ঘটনাটি পুলিশ সদস্যদের পেশাগত আচরণ ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে আরও সতর্ক হওয়ার বার্তাও বহন করছে।
