❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত বেসরকারি খাত বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে পড়েছে। শিল্প উৎপাদনে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের পাহাড় এবং বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন করনীতির কারণে নতুন বিনিয়োগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৭২ শতাংশে।
২০০৩ সাল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি। এর আগের সর্বনিম্ন হারও রেকর্ড হয়েছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঋণপ্রবাহের এই নিম্নগতি শুধু একটি আর্থিক সূচকের অবনতি নয়; বরং এটি দেশের উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের দুর্বলতার প্রতিফলন। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে এক অঙ্কের ঘরে অবস্থান করছে। বর্তমানে নতুন ঋণের চাহিদা প্রায় তলানিতে পৌঁছেছে।
ব্যাংকগুলোও এখন ঝুঁকি এড়িয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। কারণ উচ্চ খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নতুন শিল্প ও ব্যবসায়িক ঋণ বিতরণে তারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, এর সামাজিক অভিঘাতও গভীর হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়, বেকারত্ব বাড়ে এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ফলে বেসরকারি খাতের এই দুরবস্থা দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণের উচ্চমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট, উচ্চ সুদহার, ডলারের বাজারে অস্থিরতা এবং বিনিয়োগ নিরুৎসাহিতকারী করনীতি ব্যবসায়ীদের আস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
একদিকে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে অনাগ্রহী হয়ে উঠছে, অন্যদিকে উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। এই খাত যদি দুর্বল হয়ে পড়ে বা মন্দায় আক্রান্ত হয়, তাহলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও থমকে যেতে বাধ্য।
তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা যাতে বেসরকারি খাত অর্থনীতিতে তার পূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং ব্যবসার পথে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
ড. মুজেরির মতে, ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরলেও কার্যকর সমাধান খুব একটা আসেনি। তাই আসন্ন বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করতে বাস্তবমুখী ও কার্যকর উদ্যোগ থাকতে হবে। তিনি মনে করেন, অর্থনীতির স্থবির চাকা সচল করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
শিল্প খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের শিল্প খাত প্রায় পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই ২০২২ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এই দীর্ঘ সংকটের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করে। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় শিল্পকারখানার প্রয়োজনীয় কাঁচামাল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সময়মতো কাঁচামাল সংগ্রহ করতে না পারায় উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ধারাবাহিক পতন দেশে নতুন শিল্প স্থাপন এবং বিদ্যমান শিল্প সম্প্রসারণ কার্যত স্থবির করে দিয়েছে।
ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মতে, ব্যাংক খাতে মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক খাতের নানা অনিয়ম তারল্য সংকটকে আরও তীব্র করেছে। এর ফলে শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে এবং ঋণের সুদের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণ করতে গিয়ে গত কয়েক বছরে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় দেড় বছর ধরে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রেখেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে না নামা পর্যন্ত এই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকবে। এর প্রভাবে ব্যাংকঋণের সুদহার বর্তমানে ১৪ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, এত উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগ লাভজনক করা কঠিন। ফলে অনেকে নতুন প্রকল্প গ্রহণ থেকে বিরত থাকছেন।
দীর্ঘদিনের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটও শিল্প উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ইরানকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়েছে। এর প্রভাবও দেশের শিল্প খাতে পড়ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ছাড়া শিল্পে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পতন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩৮ কোটি মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ১৫৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে ১০. ৪৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
একই সময়ে দেশের মোট এলসি নিষ্পত্তির পরিমাণও কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে মোট এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৫০.৪৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫২.৬১ বিলিয়ন ডলার। ফলে সামগ্রিক আমদানি কার্যক্রমেও ৪.১৪ শতাংশ পতন ঘটেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এই পতন দেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত বহন করছে।
এদিকে অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বড় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, এই তহবিলের মাধ্যমে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু হবে, নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ সতর্ক করে বলেছেন, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, সরবরাহ সংকট এবং কাঠামোগত সমস্যার সমাধান ছাড়া কেবল প্রণোদনা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। বরং সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে অতিরিক্ত তারল্য মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ধরা হচ্ছে। এই বাজেটকে ঘিরে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করেছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), এফবিসিসিআই, এমসিসিআই এবং এফআইসিসিআইসহ শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামানো, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাকে সহজ করা, এসএমই খাতের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন, রপ্তানি প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি।
তারা উৎপাদন পর্যায়ে অগ্রিম কর (এটিআই) এবং অগ্রিম ভ্যাট (এটিভি) ধাপে ধাপে প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে করপোরেট করের হার যৌক্তিকীকরণ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, আগামী বাজেটকে অবশ্যই বেসরকারি খাতের বিকাশমুখী হতে হবে।
তিনি মনে করেন, সরকারকে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণনির্ভর ঘাটতি অর্থায়ন কমাতে হবে, যাতে বেসরকারি খাতের জন্য আরও বেশি অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত হয়।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান করদাতাদের ওপর নতুন করের চাপ না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ করাই রাজস্ব বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশের একটি অংশ বিদেশে, বিশেষ করে ভারতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এতে শুধু শিল্প নয়, কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
তার মতে, বর্তমান বাস্তবতায় নতুন শিল্প স্থাপনের চেয়ে বিদ্যমান শিল্পকে টিকিয়ে রাখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো শিল্প খাতে নতুন ঋণ দিতে অনাগ্রহী। ফলে শিল্প খাতের পুনরুদ্ধার আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, আসন্ন বাজেট শুধু রাজস্ব ও ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এটি হতে হবে বেসরকারি খাত, শিল্প উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারের একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। কারণ দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ এখন অনেকাংশেই নির্ভর করছে বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর।
