বেইজিংয়ে পুতিন-শি বৈঠক: ‘বহুমেরু বিশ্ব’ গড়ার অঙ্গীকার, ৪০টি নথি স্বাক্ষরিত

বেইজিংয়ে পুতিন-শি বৈঠক: ‘বহুমেরু বিশ্ব’ গড়ার অঙ্গীকার, ৪০টি নথি স্বাক্ষরিত
শেয়ার করুন

❐ আন্তর্জাতিক ডেস্ক


চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে বুধবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে একটি ‘বহুমেরু বিশ্ব’ এবং ‘নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে।

গ্রেট হল অব দ্য পিপলে আয়োজিত এই শীর্ষ সম্মেলনে মোট প্রায় ৪০টি দ্বিপাক্ষিক দলিল সই হয়েছে — সরকারি, দপ্তর পর্যায়ের এবং কর্পোরেট চুক্তি মিলিয়ে।

শি জিনপিং জানান, এটি পুতিনের চীন সফরের ২৫তম সংস্করণ, যা নিজেই দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতার প্রমাণ। তিনি রুশ-চীন সম্পর্ককে বড় দুটি শক্তির মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ‘সেরা নমুনা’ বলে বর্ণনা করেন।

একইসাথে তিনি একতরফা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেন, এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ‘জঙ্গলের আইন’ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দুই স্থায়ী সদস্য হিসেবে রাশিয়া ও চীন জাতিসংঘের কর্তৃত্ব রক্ষায় এবং একতরফাবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে বলে শি প্রতিশ্রুতি দেন।

পুতিন জানান, ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

উল্লেখযোগ্যভাবে, দ্বিপাক্ষিক আমদানি-রপ্তানির প্রায় সম্পূর্ণ অংশ এখন রুবল ও ইউয়ানে সম্পন্ন হচ্ছে, ফলে ডলারনির্ভর বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার প্রভাব থেকে দুই দেশের মধ্যকার লেনদেন অনেকাংশে মুক্ত হয়েছে।

শি-ও এই অগ্রগতিকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যেই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে।

জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে পুতিন জানান, রাশিয়া চীনে তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কয়লার অন্যতম বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে অব্যাহতভাবে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রোসাটমের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পও এগিয়ে চলেছে।

তিয়ানওয়ান এবং সুদাপু পারমাণবিক কেন্দ্রে রুশ নকশার ইউনিটগুলো শীঘ্রই চালু হওয়ার পথে, যা চীনের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এছাড়া পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিখাতে সহযোগিতা এবং রুশ ও চীনা পরিবেশ শংসাপত্রের পারস্পরিক স্বীকৃতির বিষয়ে একটি সমঝোতাপত্রও এবারের সফরে সই হয়।

তবে সকলের দৃষ্টি ছিল ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া ২’ গ্যাস পাইপলাইন চুক্তির দিকে। মঙ্গোলিয়ার মধ্য দিয়ে ইয়ামাল উপদ্বীপ থেকে উত্তর চীনে বার্ষিক ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস পরিবহনের এই প্রস্তাবিত প্রকল্পে এবারও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত হয়নি।

ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, মূল শর্ত ও রুটে সম্মতি হয়েছে, কিছু ছোট বিষয় চূড়ান্ত হওয়া বাকি।

পরিবহন ও অবকাঠামো খাতেও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে।

পুতিন জানান, ট্রান্স-সাইবেরিয়ান এবং বাইকাল-আমুর রেলপথের আধুনিকায়ন চলছে এবং উত্তর মেরু হয়ে আর্কটিক পথে বাণিজ্যিক পরিবহনের সম্ভাবনাও বিস্তৃত করা হচ্ছে।

মানবিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গত বছর বেইজিং সফরে শি জিনপিংয়ের প্রস্তাবে রুশ-চীন পারস্পরিক ভিসামুক্ত ভ্রমণ চালু হওয়ার পর ২০২৫ সালে ২০ লাখেরও বেশি রুশ নাগরিক চীন সফর করেছেন, এবং ১০ লাখের বেশি চীনা নাগরিক রাশিয়া ভ্রমণ করেছেন। এবারের সফরে দুই নেতা যৌথভাবে ‘রুশ-চীন শিক্ষা বছর’ উদ্বোধন করেন।

২০০১ সালে স্বাক্ষরিত রুশ-চীন শুভ প্রতিবেশিত্ব, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির ২৫তম বার্ষিকীতে দুই নেতা এই চুক্তি নবায়ন করেছেন।

পাশাপাশি ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও দৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি সম্বলিত একটি যৌথ বিবৃতিও সই হয়। দুই দেশ শাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, ব্রিকস এবং জি-২০ মঞ্চে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অব্যাহত রাখার কথাও নিশ্চিত করেছে।

২০২২ সালে ইউক্রেন অভিযান শুরুর পর থেকে পশ্চিমা কূটনৈতিক চাপের মুখে মস্কো-বেইজিং সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গে শি জিনপিং বলেন, সেখানে আরও সংঘাত অযৌক্তিক, এবং ব্যাপকভিত্তিক যুদ্ধবিরতিকে তিনি এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরের সঙ্গে তুলনা নিরুৎসাহিত করে পেসকভ বলেন, বাহ্যিক অনুষ্ঠান নয়, বরঙ মূল বিষয়বস্তু দিয়েই দুটি সফরের মূল্যায়ন করা উচিত।

Visited 3 times, 1 visit(s) today