মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে: স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্ববৃহৎ গণহত্যা হয়েছিল চুকনগরে

মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে: স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্ববৃহৎ গণহত্যা হয়েছিল চুকনগরে
শেয়ার করুন

– বাঁধন মুন্সি

পাঁচই জৈষ্ঠ্য, ২০ই মে, বৃহস্পতিবার, ১৯৭১।

রাজাকারদের লুটপাট আর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে তিন ছেলে সহ গ্রামের অন্যদের সাথে নৌকায় চুকনগর আসি। বাড়িতে নাস্তা করে আসতে পারিনি। নৌকা থামিয়ে নাস্তা খাবো, সব বের করিছি…

এমন সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি এলো। এসেই গুলি করতে শুরু করলো। জীবন বাঁচানোই দায়। নৌকা থেকে আমার এক ছেলেকে তুলে নিয়ে গেলো। আর দুটো যে কনে গেলো বলতি পারিনে।

আমি কান্নাকাটি করে পাগলের মতো হয়ে গেছিলাম। উলঙ্গের মতো। একটা সায়া পরনে ছিলো। আর ব্লাউজটা পরা ছিলো। আর কাপড় কোথায় ভাসছে জানিনে।

তারপরে ঐ ছেলেটার জইন্য, যখন মাঠের উপর দেখলাম ওরে… অই যে রাইফেলের মাথায় ঐ ছোরার মতো কি থাকে না, তাই দিয়ে ওরে খুঁচাইছে। ওরে বাবা, সেই দৃশ্য দেখা যায় না।

দেড় ভরি সোনার জিনিস সহ টাকা পয়সা সহ যা ছিলো সব ওদের সামনে ফেলে দিয়ে বললাম, ” তোমরা আমার ধর্মের বাপ! আমার ছেলেটাকে মেরো না। ”

মৃতপ্রায় ছেলেটাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো। বুকে জড়িয়ে ধরে নদীর ধারে নিয়ে গেলাম জল খাওয়াবো বলে। একটা নৌকা, কোথায় যাচ্ছিলো জানিনা। ঝাপ মেরে উঠে পড়লাম। ছেলেটাকে বাঁচাতে পারলাম না। ঔষধ নেই, ডাক্তার নেই…
(কমলা রায়, ডুমুরিয়া, খুলনা, চুকনগরে গণহত্যা, মুনতাসীর মামুন)

বাংলাদেশের ইতিহাসে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যে গণহত্যা হয়েছিলো তার কথা আমরা খুবই কম জানি। সর্ববৃহৎ গণহত্যাটি হয়েছিলো এই ২০-ই মে, চুকনগরে।

সারা দেশ থেকেই মানুষ ছুটছে তখন ভারতের দিকে। চুকনগর হয়ে উঠেছিলো তারই এক ট্রানজিট পয়েন্ট। হাজার হাজার মানুষ দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপাতে হাঁপাতে চুকনগরে এসে জড়ো হতো। একসাথে ঢুকতো ভারতে। তখন বর্ষায় ভরে উঠেছে ভদ্রা নদী। শয়ে শয়ে নৌকা এসে ভেড়ে চুকনগরে।

বেশি না। সম্ভবত এক প্লাটুন সৈন্য এসেছিলো। ট্রাক থেকে নেমেই তারা গুলি করতে শুরু করে। গুলি ফুরিয়ে গেলে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারতে থাকে।

লাশের ওপর লাশ। বাবা জড়িয়ে আছে মেয়েকে, মা ছেলেকে। আমরা গল্প শুনি রক্তের নদীর কথা। সেদিন ভদ্রার পানি হয়ে ওঠে আক্ষরিক অর্থে রক্ত! প্রতক্ষ্যদর্শীরা বলেছে, জীবনে এরকম দেখেনাই তারা, রক্তের নদীতে ভেসে যাচ্ছে হাজার হাজার লাশ।

কতজন মারা গেছে সেদিন?

খুব কম করে হিসাব করলেও ছয় হাজার থেকে দশহাজার মানুষ মারা গেছে সেদিন।

আমরা ভুলে যাই। ভুলে যাই পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ গণহত্যার “উৎসব” পাকিস্তানিরা ঘটিয়েছিলো এই বাংলায়। তার মাঝে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারে এক দিনে, এই চুকনগরে।

যারা তিরিশ লাখের হিসাব কষতে চায়, তাদের দাড় করিয়ে দেয়া উচিত ছিলো সেদিনের সেই ভদ্রার পাড়ে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লাশ গুনতো তারা।

আমারদের এই দেশের প্রতি ইঞ্চির দাম দিয়েছি আমরা। লাশের হিসেবে, রক্তের কড়ি গুনতিতে…

Visited 3 times, 1 visit(s) today