❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নগরের জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় এই জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
পরে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে তাঁকে বিদায় জানান দলীয় সমর্থক ও নেতাকর্মীরা।
জানাজায় অংশ নেন বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন, সাবেক মেয়র ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, প্রয়াতের বড় ছেলে সাবেদুর রহমান সমুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি পেশার মানুষ।
এর আগে মরদেহ জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে পৌঁছালে বর্ষীয়ান রাজনীতিককে একনজর দেখতে ও শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নামে। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় কফিন।
সাবেক এই মন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা স্মরণ করে বক্তব্য দেন বিভিন্ন দলের নেতারা।
বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘সাবেক মন্ত্রী মোশাররফ হোসেনের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বৃহত্তর চট্টগ্রামের উন্নয়নে তিনি অনেক অবদান রেখেছেন। মিরসরাইয়ের সন্তান হলেও বৃহত্তর চট্টগ্রামের জন্য কাজ করে গেছেন। চট্টগ্রামের উন্নয়নে তাঁর অবদানের জন্য মানুষ তাঁকে স্মরণ করবেন।’
উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান বলেন, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকা চিরদিন মনে রাখতে হবে। তিনি আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছেন। সারাজীবন তাঁর সঙ্গে রাজনীতি করেছি।’
সাবেক সিটি মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘পাকিস্তান আমল থেকে উনার সাথে আমার স্মৃতি। চট্টগ্রামের উন্নয়নে অনেক উদ্যাোগ নিয়েছেন। তিনি কথা শুনতেন। চট্টগ্রামের ইতিহাসে মোশাররফ হোসেন এক অবিস্মরণীয় নাম হয়ে থাকবে।’
মোশাররফ হোসেনের সন্তান সাবেদুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকার পর তিনি চলে গেছেন। উনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। দেশের উন্নয়নে উনি কাজ করেছেন। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন।’
শ্রদ্ধা জানান সিপিবি নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন গেরিলা বাহিনী, মীরসরাই অ্যাসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।
জানাজা অংশ নেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, সিপিবি, বিএনপি ছাড়াও বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা।
পরে মরদেহের কফিন অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর পর লাখো সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহচর ও অনুসারীরা স্লোগান দিতে শুরু করেন। এ সময় ‘বীর চট্টলার মোশাররফ ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই’, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান শোনা যায়।
নেতাকর্মীরা মরদেহবাহী গাড়ির সঙ্গে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ মাঠ থেকে বের হয়ে আসেন। এসময় পুলিশ সদস্যরা মাঠের মূল ফটকে দাঁড়িয়ে ছিল। অ্যাম্বুলেন্সটি মীরসরাইয়ের ধুম গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখানে বাদ আসর ফজলুর রহমান স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে তৃতীয় নামাজের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
জানাজার ভিডিও
মোশাররফ হোসেনের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১২ই জানুয়ারি চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে। বাবা এস রহমান ষাটের দশকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন। দেশভাগের পর তিনি কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে চলে আসেন এবং ‘ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন’ নামে একটি কোম্পানি খুলে ব্যবসা শুরু করেন।
মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করেন। এরপর লাহোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় ছয় দফা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। সে সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
লাহোর থেকে দেশে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। যুদ্ধের সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনের নেতৃত্ব দেন তিনি।
১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রামের মীরসরাই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে ছয়বার এমপি হন। আমৃত্যু তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য।আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের সরকারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে ২০১৪-২০১৯ মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারেও তিনি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪-এর জুলাই সন্ত্রাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২৭শে অক্টোবর রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকা থেকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। গ্রেপ্তারের পর থেকে দফায় দফায় তাঁর ওর চালানো হয় শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্মম নিপীড়ন,নির্যাতন। কারগাারে পাননি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাও। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অবস্থা বেগতিক দেখে ইউনূস সরকার ২০২৫ সালের ৫ই অগাস্ট রাতে গুরুতর অসুস্থ এই প্রবীণ নেতাকে কারা হাসপাতাল থেকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে পাঠায়। সেখান থেকে গত ১৪ই আগস্ট জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু সেই অসুস্থতা থেকে আর রোগমুক্তি পাননি।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। তার ছেলে মাহবুব রহমান রুহেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে চট্টগ্রাম ১ আসন থেকে এমপি হয়েছিলেন।



