কারা-নির্যাতিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জীবনাবসান

কারা-নির্যাতিত বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জীবনাবসান
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা এবং সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আর নেই। কারাবন্দি অবস্থায় চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে অসুস্থতার পর আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

যুবলীগ নেতা নিয়াজ মোর্শেদ এলিট জানান, বুধবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তার পরিবারের সদস্যরা পাশে ছিলেন।

গ্রেপ্তারের পর নির্যাতন-নিপীড়ন: বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ জীবনের কঠিন অধ্যায়

২০২৪ সালের জুলাই সন্ত্রাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঢেউ এসে লাগে এই প্রবীণ নেতার জীবনেও। সরকার পতনের কিছুদিনের মধ্যেই, ওই বছরের ২৭শে অক্টোবর রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকা থেকে এই বয়ঃবৃন্ধ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর তাকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

পুলিশি রিমান্ডের নামে বর্বরতা এবং পরে কারাগারে থাকাকালীন তার ওপর শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন চালানো হয়। পাননি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগের সুচিকিৎসাও। চরম মানবেতার অবস্থায় কারাগারে দিন কেটেছে তার। ফলে স্বাস্থ্যের ক্রমশ অবনতি ঘটতে থাকে।

২০২৫ সালের ৫ই আগস্ট রাতে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে কারাগারের হাসপাতাল থেকে তাকে দ্রুত বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন ফোরামে তুমুল সমালোচনার পর ১৪ই আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু চরম নির্যাতনের ফলে তার স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

শিক্ষাজীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম

১৯৪৩ সালের ১২ই জানুয়ারি চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার ধুম গ্রামে এক রাজনৈতিক পরিবারে মোশাররফ হোসেনের জন্ম। তার বাবা এস রহমান ষাটের দশকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন। দেশভাগের পর কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে ফিরে তিনি ‘ওরিয়েন্ট বিল্ডার্স কর্পোরেশন’ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

শিক্ষাজীবনের শুরু চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে, যেখান থেকে তিনি মেট্রিক পাস করেন। এরপর স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান পশ্চিম পাকিস্তানে। লাহোরের ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পেশাদার পরিচয় হিসেবে এই ‘ইঞ্জিনিয়ার’ শব্দটি পরবর্তীতে তার নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধুর সাথে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন (ছবিতে বাম পাশে উপবিষ্ট)

লাহোরে পড়াশোনার সময়েই মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হন এবং সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

লাহোর থেকে দেশে ফিরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন এবং ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও তার পরিবারে প্রবাহিত হয়েছে। তার ছেলে মাহবুব রহমান রুহেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সাহসী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধকালীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনে নেতৃত্ব দেন।

স্বাধীনতার পর তিনি সক্রিয়ভাবে দেশ পুনর্গঠনেও অংশ নেন এবং ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম একজন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেন।

সংসদীয় ও মন্ত্রিত্বের দীর্ঘ পথচলা

রাজনীতিতে মোশাররফ হোসেনের সাফল্য ছিল ঈর্ষণীয়। চট্টগ্রামের মীরসরাই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তিনি ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে — মোট ছয়বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আমৃত্যু তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন।

মন্ত্রিত্বেও তার অবদান কম নয়। আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের সরকারে তিনি প্রথমে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান, পরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪-২০১৯ মেয়াদেও তিনি একই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর আসনে বসেন।

ছয় দফার সৈনিক থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা , সংবিধান প্রণেতা থেকে ছয়বারের সংসদ সদস্য — ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জীবন ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই এক জীবন্ত দলিল। তার মৃত্যুতে দেশ হারাল একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী সৈনিককে।

কারা হেফাজতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিভিন্ন তথ্য এখানে

Visited 26 times, 1 visit(s) today