❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
আসন্ন ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে এ বছর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে।
বিএনপি সরকারের সংশ্লিষ্ঠদের নিয়ন্ত্রণে এবার গরুর বাজার। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও সক্রিয়ভাবে ইজারা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে তোড়জোর শুরু করেছে।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, এ বছর অধিকাংশ হাটের নাম বদলে কাগজে-কলমে আয়তন কমিয়ে সরকারি ইজারা মূল্য হ্রাস করা হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, যাত্রাবাড়ীর কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ি পর্যন্ত হাটের সরকারি মূল্য গত বছরের ৪ কোটি ৭২ লাখ থেকে কমিয়ে এবার ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এতেও প্রতিযোগিতা থামেনি — চারটি দরপত্রের মধ্যে তিনটিতে ৪ কোটি টাকার বেশি দর এসেছে।
হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি কলেজ-সংলগ্ন হাটের ক্ষেত্রেও একই কৌশল নেওয়া হয়। হাটের অবস্থান পরিবর্তন করে এবার সরকারি মূল্য ৭৪ লাখ কমিয়ে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা করা হয়েছে।
তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে নাটকীয় হ্রাস দেখা গেছে কমলাপুরের সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টার-সংলগ্ন হাটে — গত বছর ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ওই হাটটি এ বছর মাত্র ১ কোটি ৪০ লাখ টাকায় নির্ধারিত হলেও শেষ পর্যন্ত পাঁচটি দরপত্র জমা পড়ে এবং সর্বোচ্চ দর ওঠে ৩ কোটি ১ লাখ টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই হাটের জায়গার নাম বদলে আয়তন কমিয়ে সরকারি মূল্য হ্রাস করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, “দরপত্র বিক্রি ও জমাদানেও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ হাটে দরদাতারা একাধিক রাজনৈতিক দলের হওয়ায় দরপত্রে প্রতিযোগিতা হয়েছে। ডিএসসিসির পশুর হাটে দুই দশক পর এ রকম প্রতিযোগিতা দেখা গেছে।”
জামায়াতে ইসলামীর নেতারা এবার প্রথম ডিএসসিসির পশুর হাটের ইজারায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন।
দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতারা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারা সরকারি দরপত্র প্রতিযোগিতায় অংশ নেননি। ২০২৫ সালে অংশ না নিলেও এবার কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় হাটের ইজারায় নামেন তারা।
যাত্রাবাড়ীর কাজলা হাটে স্থানীয় জামায়াত নেতা শামীম খানের প্রতিষ্ঠান ‘কে বি ট্রেড’ সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা দর দিয়েছে, যেখানে বিএনপির তারিকুল ইসলাম তারেক ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দিলেও দর উল্লেখ করেননি।
এ হাটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা না করে সম্পত্তি বিভাগ সর্বোচ্চ পে-অর্ডার দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে দর জানাতে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই প্রতিযোগিতা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গত ২৭শে এপ্রিল শ্যামপুর কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ড-সংলগ্ন হাটের দরপত্র সংগ্রহ করতে শ্যামপুর থানা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে দলীয় কর্মীরা ডিএসসিসিতে গেলে সেখানে শ্যামপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিমেল ও যাত্রাবাড়ী থানা বিএনপির নেতা শ্যামলের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হয় এবং ডিএসসিসির সব আঞ্চলিক কার্যালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দরপত্র বিক্রি নিশ্চিত করা হয়।
হাটওয়ারি ইজারার চিত্র
পোস্তগোলা শ্মশানঘাট হাট: সরকারি মূল্য ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা হলেও বিএনপি-সমর্থিত কাজী মাহবুব মওলা হিমেল ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন। জামায়াত-সমর্থিত মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন দর দিয়েছিলেন ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ হাট: সরকারি মূল্য ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা হলেও সাবেক বিএনপি কাউন্সিলর আনিসুর রহমান টিপু গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দিয়ে ৩ কোটি ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন।
আমুলিয়া মডেল টাউন হাট: সরকারি মূল্য ৫৩ লাখ টাকায় নামিয়ে আনলেও ডেমরা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি জয়নাল আবেদিন রতন এবার ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন — গত বছরের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি।
গোলাপবাগ মাঠ হাট: নতুন এই হাটে ছয়টি দরপত্রের মধ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা আহসানউল্লাহ ২ কোটি ৫ লাখ টাকায় সর্বোচ্চ দরে ইজারা নিয়েছেন। এই হাটে জামায়াত ও এনসিপির নেতারাও পৃথকভাবে দর দিয়েছিলেন।
সাদেক হোসেন খোকা মাঠ ও ধোলাইখাল ট্রাক টার্মিনাল হাট: এ হাটটিতে স্থানীয় বিএনপি নেতা তুষার আহমেদ ইমরান একমাত্র দরদাতা হিসেবে মাত্র ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা দর দিয়েছেন, যা সরকারি মূল্য ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার অনেক কম। তুষার আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, “হাটের সঙ্গে সবাই জড়িত আছে, একা তো হাটের ইজারা নেওয়া যায় না।”
শ্যামপুর কদমতলী ও রহমতগঞ্জ হাট: এ দুটি হাটে এখন পর্যন্ত কোনো দরপত্র জমা পড়েনি।
সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ
সব হাটে প্রতিযোগিতা না হলেও বেশির ভাগ হাটেই দর সরকারি মূল্যকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে দুটি হাটে সিন্ডিকেটের কারণে কোনো দরই পড়েনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গত বছর ধোলাইখাল হাটে সরকারি মূল্যের বেশি দর দেওয়া সত্ত্বেও এনসিপির এক নেতাকে সিন্ডিকেটের চাপে ইজারা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সার্বিকভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোরবানির পশুর হাটের ইজারা শুধু ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা নয়, এটি রাজধানীতে রাজনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারেরও একটি প্রতিফলন।
এ বছর বিএনপির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে ফাটল ধরিয়ে জামায়াতের প্রবেশ সেই রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
