বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সশস্ত্র ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর অস্ত্রাগার লুট, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জঙ্গি হামলা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতরে অনুপ্রবেশের পরিকল্পনার অভিযোগে তিনজনকে আটক করা হয়েছে।
একইসঙ্গে সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের অর্ধশতাধিক সদস্যকে নজরদারির আওতায় এনে হাউজ অ্যারেস্ট বা সীমিত চলাচলে রাখা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানে নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বাংলাদেশি তরুণদের উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। চাকরি, বিদেশে যাওয়ার সুযোগ এবং আর্থিক সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে কিছু তরুণকে পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার তথ্যও মিলেছে।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে শাহবাগে জঙ্গিগুরু জসীমউদ্দীন রাহমানী
সংসদে সশস্ত্র হামলার পরিকল্পনাকারী জঙ্গি উসামার জামায়াতে যোগদান নিয়ে তীব্র সমালোচনা
ইউনূস জমানায় জঙ্গিবাদের অবাধ বিচরণ, বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বানানোই লক্ষ্য?
পাকিস্তানের অভ্যন্তরে টিটিপির হয়ে যুদ্ধে বাংলাদেশি নাগরিকদের অংশগ্রহণের খবরও তদন্তকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সারাদেশব্যাপি অস্থিরতার সুযোগে জঙ্গি সন্দেহে কারাগারে আটক থাকা অনেক ইসলামিক উগ্রবাদে জড়িত ও বান্দরবনে সশস্ত্র প্রশিক্ষন নেয়া সদস্যরা জেল থাকে পালিয়ে যায়।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছিলেন দেশে কোন জঙ্গি নাই। আইনও উপদেষ্টা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেন, শেখ হাসিনার সরকার মিথ্যা অভিযোগে শুধু ধর্মীয় পোশাক, টুপি-দাঁড়িওয়ালা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জঙ্গি সাজিয়ে গ্রেপ্তার করেছিল।
সেই ইউনূস সরকার একে একে সন্ত্রাসীদের মামলা থেকে জামিনে মুক্ত করে দেয় অনেক জঙ্গিকে। জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শরকিয়া নামে একটি ভয়ঙ্কর উগ্রপন্থী জঙ্গি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ মোহিবুল্লাহসহ আরও অনেকেই ছাড়া পায় ৫ই আগস্টের পর।
ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার ৩ মাসের মধ্যে এখনও এসব জঙ্গিদের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো তথ্য পায়নি, জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোরও কোনো সন্ধান পায়নি। এতে স্পষ্ট যে, ৫ই আগস্টের পরে এই জঙ্গিরা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছে। কোনো গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। টিটিপি উদ্ধারকৃত এই নেটওয়ার্ক আর রাষ্ট্রিয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সাথে সংশ্লিষ্টতার সুত্র বলে দেয়, বিগত ২০ মাসে জঙ্গিবাদের নেটওয়ার্ক অনেক গভীরে বিস্তৃত হয়েছে।
কারামুক্ত জঙ্গিনেতার হুমকিতে চার শীর্ষ সংবাদপত্রে থরহরি কম্প, কড়া নিরাপত্তা
ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন: বাংলাদেশে প্রশ্রয় পাচ্ছে উগ্রবাদী শক্তি
বৈষম্যবিরোধীদের আন্দোলন-হুমকিতে কারামুক্ত ভয়ঙ্কর জঙ্গি মহিবুল্লাহ
টিটিপি’র বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সাথে জড়িত সন্দেহে আটক করা হয়েছে ইসতিয়াক আহমেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদ ওরফে আবু আহমেদ নামের নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন দাওলাতুল ইসলাম বাংলাদেশের-এর এক সদস্যকে।
সংগঠনটি ইসলামিক স্টেট-আইএস এর বাংলাদেশি মতাদশী হিসেবে পরিচিত। একইসাথে নব্য জেএমবিপন্থী আদর্শে পরিচালিত জঙ্গি সংগঠন। আটককৃত সামীর সাথে চাকুরিচ্যুত সেনা সদস্যদের যোগাযোগের তথ্যও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
জঙ্গি কার্যক্রম ও হামলার পরিকল্পনায় জড়িত সন্দেহে আটককৃত অন্য দুই ব্যাক্তি হলেন মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদ ও মো. রাকিব হাসান ওরফে উবাইদা আল উসামা। এই দুজনেই চাকুরিচ্যুত সাবেক সেনা সদস্য।
এর আগে গত ২৩শে এপ্রিল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতি নদী থেকে আফগানিস্তানের নাগরিক হাশমত মোহাম্মাদির লাশ উদ্ধার হয়। এর পর থেকেই সশস্ত্রবাহিনী সহ বিভিন্ন সংস্থায় শুদ্ধি অভিযান শুরু হয় এবং প্রায় অর্ধশতাধিক সদস্যকে টিটিপি’র সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গৃহবন্দি করা হয়।
এছাড়া শতাধিক সদস্য গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে। বাহিনীর সদস্যদের আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং অনলাইন কার্যক্রমও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনা সরকারের হাতে আটক – ইউনূস আমলে মুক্ত হিন্দাল জঙ্গিরাই মার্কিন দূতাবাসে হামলাচেষ্টায় জড়িত
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জঙ্গিবাদী মামলায় অভিযুক্ত শতাধিক ব্যক্তি জামিনে মুক্ত- বিবিসি’র প্রতিবেদন
ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের বিস্তার
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আগে এসব সংগঠন মূলত দরিদ্র ও বেকার তরুণদের টার্গেট করলেও এবার তারা আইনশৃঙ্খলা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর উচ্চমানের প্রশিক্ষিত সদস্যদের দিকে নজর দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কোনো সদস্য উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়লে তা দেশের জন্য বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
কারণ, তারা একদিকে নিজেরা যেমন উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, অন্যদিকে তারা নিজেরাই যেকোন বাহিনীকে সুসংগঠিত করা, রিক্রুট করা, প্রশিক্ষণ প্রদান, অস্ত্র ও রসদ সংগ্রহে দক্ষ। পাশাপাশি তারা নেতৃত্ব দিয়ে যেকোন জঙ্গি বাহিনীকে রাষ্ট্রের প্রশিক্ষিত বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে সক্ষম।
ইতোমধ্যে টিটিপির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে শাকিল হাসান নামের এক পুলিশ কনস্টেবলের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পরপরই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, তিনি একা নাকি আরও বড় কোনো নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করছিলেন।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গি হামলার আশঙ্কা এবং বাহিনীর মধ্যে অনুপ্রবেশের ঝুঁকি নিয়ে সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে পুলিশপ্রধান কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং এন্টি টেররিজম ইউনিটকে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অনলাইন নজরদারি বাড়ানো এবং সন্দেহভাজনদের ওপর কঠোর পর্যবেক্ষণ চালানোর সিদ্ধান্তও হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আটক তিনজনের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অস্ত্রাগার লুটের পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।
যদি এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতো, তাহলে বিপুল পরিমাণ আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ নিরাপত্তা সরঞ্জাম জঙ্গিদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। এর মাধ্যমে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সমন্বিত হামলার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারত।
গোয়েন্দা নজরদারিতে আরও উঠে এসেছে, টিটিপি-সংশ্লিষ্ট কিছু নেটওয়ার্ক ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং হুন্ডি চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করছে। বিদেশ থেকে গোপনে অর্থ এনে তা সংগঠনের কাজে ব্যবহারের তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে।
এর আগে ২০২৫ সালে পাকিস্তানে টিটিপিতে যোগ দিয়ে সেনা অভিযানে নিহত হন বাংলাদেশি তরুণ ফয়সাল হোসেন। পরিবার জানত তিনি দুবাইয়ে কর্মরত ছিলেন। পরে জানা যায়, তিনি পাকিস্তানে গিয়ে জঙ্গি সংগঠনের হয়ে যুদ্ধ করছিলেন। ঘটনাটি বাংলাদেশি তরুণদের বিদেশে চাকরির প্রলোভনে ফাঁদে ফেলার কৌশল সামনে নিয়ে আসে।
পরবর্তীতে অন্তত আরও ৮ বাংলাদেশি জঙ্গির তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যাদের কেউ আফগানিস্তানের তালেবানদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে, আবার কেউ তালেবানদের হয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দুর্বল করা এবং ভয়ভীতি তৈরি করে উগ্রবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া।
তারা বলছেন, বাংলাদেশ অতীতে জঙ্গিবাদ দমনে সফলতা দেখিয়েছে। তবে নতুন কৌশলে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্ক মোকাবিলায় এখন আরও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কঠোর গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সামাজিক সচেতনতা জরুরি হয়ে পড়েছে।



