❐ বিশেষ প্রতিবেদক
দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখন লাগামহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। মুরগি, ভোজ্যতেল, চিনি, এলপিজি ও সবজিসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম একযোগে বাড়ায় অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ তুলনামূলক কম দামের পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন।
বাজারে গেলেই শোনা যাচ্ছে- প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝাড়ছেন সাধারণ মানুষ। শুধু নিম্নবিত্তের মানুষ নয়, মধ্যবিত্তদেরই নাগালের বাইরে চলে গেছে পণ্যের দাম। বিক্রেতার সাথে ক্রেতাদের রাগারাগি, কথা কাটাকাটি থেকে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে। আর এসবের পেছনে সরকারি অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছে মানুষ।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারদরে।
রাজধানীসহ সারাদেশের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে মুরগির। প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস সোনালি মুরগি বর্তমানে কেজিপ্রতি ৪৩০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগে ছিল ২৭০ থেকে ৩২০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির দাম দাঁড়িয়েছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা। এর প্রভাব পড়েছে গরুর মাংসের বাজারেও কেজি প্রতি দাম ৮০০ টাকার নিচে নামছে না।
ভোজ্যতেলের বাজারেও চলছে অস্থিরতা। সরবরাহ সংকটের কারণে খোলা ও বোতলজাত উভয় ধরনের তেলের দাম বেড়েছে। খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা এবং পাম অয়েল ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক মাস আগেও যথাক্রমে ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা ও ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকার মধ্যে ছিল। বোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ে নির্ধারিত মূল্য ১৯৫ টাকা থাকলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকায়।
চিনির বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ঈদের আগে প্রতি কেজি চিনি ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৫ টাকায়।
ব্যবসায়ীরা জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ভোজ্যতেলের সংকট তীব্র হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব দেশীয় বাজারে পড়ছে। পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন খরচ বাড়াও মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এসব সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সিন্ডিকেটও দাম বাড়াতে তৎপর বলে ক্রেতারা জানান।
ভোক্তারা জানান, সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রান্নার গ্যাসে। এপ্রিল মাসে ১২ কেজি এলপিজির দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বেড়ে ১,৭২৮ টাকায় নির্ধারণ করা হলেও বাজারে তা প্রায় ২,০০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। ঈদের আগের তুলনায় প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে করলা, বরবটি ও ধুন্দলসহ অধিকাংশ সবজি ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বৃষ্টি এবং মৌসুমের শেষ পর্যায়ে থাকার কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির হার কমে ৮.৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ৯ শতাংশের বেশি ছিল। তবে বাস্তব বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে এই তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনের নেতারা বলছেন, ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় পণ্যের দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বাজার তদারকির ঘাটতির সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করছেন।
তাদের মতে, খামার পর্যায়ে উৎপাদন কমে যাওয়ায় মুরগির সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। যদিও আলু ও পেঁয়াজের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে, তবুও সার্বিকভাবে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়িয়ে তুলেছে।


