– সাইফুর রহমান
“আমার ৪৭তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে ১৯২০ সালে পূর্ব বাংলার এক ছোট্ট পল্লীতে জন্মগ্রহণ করি। আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনোদিন নিজে পালন করি নাই—বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটি উপহার দিয়ে থাকত। এই দিনটিতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে। খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধ হয়, আমি জেলে বন্দি আছি বলেই। ‘আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস!’ দেখে হাসলাম।”
— *কারাগারের রোজনামচা* (পৃষ্ঠা ২০৯)
এই কয়েকটি লাইনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে একজন মহান নেতার অসাধারণ মানবিকতা, বিনয় আর আত্মত্যাগের ইতিহাস।
একজন মানুষ, যিনি জন্মেছিলেন পূর্ব বাংলার এক অজ পল্লীতে—কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি পুরো জাতিকে মুক্ত করা। নিজের জন্মদিনকে তিনি কখনো বড় করে দেখেননি। তাঁর কাছে জন্মদিন মানে ছিল না উৎসব, কেক, আলো কিংবা ব্যক্তিগত আনন্দ।
বরং তাঁর জীবনের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন—কারাগারের অন্ধকার কক্ষ, রাজনৈতিক সংগ্রাম, আর মানুষের অধিকার আদায়ের নিরন্তর লড়াই।
এই লেখাটি তিনি লিখছেন যখন তিনি কারাগারে বন্দি। বাইরে তাঁর সহকর্মীরা তাঁর জন্মদিন পালন করছে—কিন্তু তিনি নিজে সেই খবর পড়ে হেসে ফেলছেন। কেননা তাঁর কাছে নিজের জন্মদিন উদযাপন করা যেন এক অদ্ভুত ব্যাপার। তিনি নিজেকে শুধু একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই দেখতেন—ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত মহিমার প্রতীক হিসেবে নয়।
এই বিনয়ই তাঁকে করেছে অনন্য।
এই আত্মত্যাগই তাঁকে করেছে ইতিহাসের অংশ।
তিনি এমন এক নেতা, যিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, আনন্দ—সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন দেশের মানুষের জন্য। তাঁর জন্মদিনের দিনেও তিনি ছিলেন কারাগারে, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল দেশের মানুষকে নিয়ে, তাদের ভবিষ্যৎকে নিয়ে।
তাই ১৭ মার্চ শুধু একটি জন্মতারিখ নয়।
এটি একটি আদর্শের জন্মদিন।
এটি এক অবিনশ্বর সংগ্রামের স্মৃতি।
যে মানুষ নিজের জন্মদিনকে গুরুত্ব দেননি, সেই মানুষটির জন্মদিনই আজ একটি জাতির গর্ব, ইতিহাস এবং অনুপ্রেরণার প্রতীক।
শ্রদ্ধা সেই মহান নেতাকে, যিনি নিজের জন্য কিছু চাননি—কিন্তু একটি জাতিকে দিয়েছেন স্বাধীনতার স্বপ্ন, সাহস এবং আত্মমর্যাদার পথ।
