‘জুলাইযোদ্ধা’ সাংবাদিকের বছরে আয় ৩ লাখ, জমি ক্রয় ৩ কোটির: সন্দেহজনক লেনদেন ১৭ কোটির!

‘জুলাইযোদ্ধা’ সাংবাদিকের বছরে আয় ৩ লাখ, জমি ক্রয় ৩ কোটির: সন্দেহজনক লেনদেন ১৭ কোটির!
শেয়ার করুন

নিজেদের দ্বন্দ্বে ফাঁস আর্থিক লেনদেনের তথ্য, দুদকে লিখিত অভিযোগ

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


বার্ষিক আয় মাত্র সাড়ে ৩ লাখ টাকার কাছাকাছি। অথচ সেই আয়ের বিপরীতে প্রায় পৌনে ৩ কোটি টাকার জমি কেনার তথ্য উঠে এসেছে এক ‘জুলাইযোদ্ধা’ পরিচয় দেওয়া সাংবাদিকের আয়কর নথিতে।

রাজশাহীর এই তথাকথিত ‘জুলাইযোদ্ধা’ সাংবাদিক আর আই এম গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং প্রায় ১৭ কোটি টাকার সন্দেহজনক ব্যাংক লেনদেনের অভিযোগও জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)।

গত রোববার দুদকের রাজশাহী জেলার সমন্বিত কার্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক জান্নাতুল ফেরদৌস এ অভিযোগ দাখিল করেন।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী তার প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, রাব্বানী তার ২০২৩–২৪ অর্থবছরের আয়কর রিটার্নে বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন মাত্র ৩ লাখ ৪২ হাজার ৮৪০ টাকা। কিন্তু একই নথিতে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ১৫ই মে তিনি রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা এলাকার সাদিপুর মৌজায় মোট ২ কোটি ৭৪ লাখ ৮ হাজার ৭০০ টাকায় প্রায় ৮ দশমিক ৩০ একর অকৃষি জমি ক্রয় করেছেন।

নথি অনুযায়ী, ওই দিনই তিনি ৫.১৫ একর জমি ১ কোটি ৬৪ লাখ ৯২ হাজার ৩০০ টাকায় এবং আরও ৩.১৫ একর জমি ১ কোটি ৯ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ টাকায় কিনেছেন।

ঘোষিত আয়ের সঙ্গে এই বিপুল বিনিয়োগের কোনো সুস্পষ্ট উৎস না থাকায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আর আই এম গোলাম রাব্বানী রাজশাহীর সাংবাদিক মহলে পরিচিত একটি নাম। তিনি ঢাকার একটি প্রথম সারির মিক্সড টেলিভিশন চ্যানেলের রাজশাহী প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তার পারিবারিক বাড়ি জয়পুরহাটে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রাব্বানীর পিতা জামায়াতে ইসলামীর একজন রুকন।

রাজনৈতিক সূত্র বলছে, মতাদর্শগতভাবে ভিন্ন হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় এক দশক তিনি দলের দুই কেন্দ্রীয় নেতার আশ্রয়ে রাজশাহীতে সক্রিয় ছিলেন। একই সময়ে তুরস্কের একটি উগ্রবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের নেটওয়ার্কের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রগুলো জানায়, ২০২৩ সালে তুরস্কের আমন্ত্রণে তিনি কয়েকজন আওয়ামীবিরোধী মতাদর্শী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়ে দেশটিতে সফরও করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় গুপ্ত সংগঠন ছাত্রশিবিরে যুক্ত শিক্ষার্থী ও জামায়াতঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

এই নেটওয়ার্কের সূত্র ধরেই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রাব্বানী।

স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতার ঘনিষ্ঠ হওয়ায় দলের ভেতরের নানা তথ্যও আন্দোলনের কৌশলে ব্যবহার করা হতো।

তবে ৩রা আগস্ট বিষয়টি স্থানীয় আওয়ামী লীগের মধ্যে জানাজানি হলে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। পরে ৫ই আগস্ট মহানগর আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা তাকে দলীয় কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করেন।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গোলাম রাব্বানী নিজেকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মামলার নথি থেকে অভিযুক্তদের নাম বাদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আদায় করেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের অফিস কক্ষ থেকে সরকারি তহবিলের ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা চুরি করে তা আত্মসাৎ করেন রাব্বানী।

এছাড়া রাব্বানী ও তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবেও প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে দুদকের কাছে তার আর্থিক কার্যক্রম, জমি ক্রয় এবং ব্যাংক লেনদেন তদন্ত করার অনুরোধ জানিয়েছেন অভিযোগকারী।

এর আগে জান্নাতুল ফেরদৌস যৌন হয়রানির অভিযোগে রাজশাহীর চন্দ্রিমা থানায় গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে একটি মামলাও দায়ের করেছেন।

তবে রাব্বানী ও জান্নাতুলের একাধিক ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে গোপন সম্পর্ক ছিল। এমনকি রাজশাহীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জান্নাতুলকে চাকরি পেতেও প্রভাব খাটিয়েছিলেন রাব্বানী।

সম্প্রতি তাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়।

স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, রাজশাহীতে এনসিপির দুই গ্রুপের কোন্দল এবং গত প্রায় দেড় বছরে আর্থিক লেনদেনের ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকেই এই বিরোধের সূত্রপাত।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম রাব্বানী বলেন, “যেকোনো ব্যক্তি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার অর্থ এই নয় যে সেই ব্যক্তি দোষী। আমি এখানে কোনো ভুল দেখি না। আমি জানি আমি কে এবং আমি কী করেছি।”

এদিকে অভিযোগটি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে দুদক সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Visited 15 times, 1 visit(s) today