যে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়েছিলেন ছাত্রনেতারা তাকে নিয়েই এখন সংকট, নেপথ্যে কী?

যে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়েছিলেন ছাত্রনেতারা তাকে নিয়েই এখন সংকট, নেপথ্যে কী?
শেয়ার করুন

বিডি ডাইজেস্ট

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কে নতুন কোনো তথ্য খুব একটা নেই। যা আছে তা হলো—দুই ভিন্ন সময়ে একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ভিন্ন অবস্থান।

আর এই দ্বৈত অবস্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি, এমনকি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতির প্রশ্নটিও। শেখ হাসিনার সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এই চুপ্পু তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী মুজিব কন্যা শেখ হাসিনাকে পায়ে হাত দিয়ে সলাম করতে গিয়েছিলেন।

সংসদ অধিবেশনের দিন সেই চুপ্পু তারেক রহমানের মেযে জায়মা রহমানকে তিন তিন বার হাত উঁচু করে সালাম দিয়েছেন।

এদিকে তথা কথিত জুলাই আন্দোলনের পর ছাত্র নামধারি গুপ্ত সংগঠনের এলিট নেতাকর্মীরা ক্ষমতার লোভে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ গ্রহণ করে।

সময়ের সাথে সাথে ঘটনা ও পরিবেশ পরিস্থিতি অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। যার কাছে সেদিন শপথ নিলো, যাকে ব্যবহার করে শত শত অধ্যায়দেশ জারি করে নিলো। সেই রাষ্ট্রপতি এখন জুলাই জঙ্গিদের অপ্রিয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক সময় নতুন তথ্যের চেয়ে পুরোনো ঘটনাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যাই বড় হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর ক্ষেত্রেও হচ্ছে একই ঘটনা।

বিশ্লেষণধর্মী এক নিবন্ধে বলা না বলা এমন অনেক বিষয় তুলে ধরছেন বিডিনিউজ ২৪ ডটকমের সাংবাদিক সৌমিত জয়দ্বীপ। তার লেখনিতে মূলত যেসব বিষয় উঠে এসছে তা এই রকম-

শুরুর দৃশ্য: ২০২৪ সালের আগস্ট

ফিরে যেতে হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে। সরকার উৎখাত ষড়যন্ত্রের সফল পরিণতির পর সেই সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন আন্দোলনের ছাত্রনেতৃত্ব এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়করা। এরপর আসে ৮ই আগস্ট।

সেদিন সংবিধান সমুন্নত রেখে রাষ্ট্রপতির কাছেই শপথ নেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যরা। সেই উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন জুলাই সংঘাতের ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।অর্থাৎ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের সূচনা হয়েছিল রাষ্ট্রপতির মাধ্যমেই।

পাল্টে যাওয়া দৃশ্য: ২০২৬ সালের মার্চ

সময়ের ব্যবধানে সেই দৃশ্যপট বদলে যায়। ২০২৬ সালের ১২ই মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে বিরোধীদলীয় সদস্যদের প্রতিবাদ দেখা যায়।

আন্দোলনের সময়ের ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম তখন সংসদ সদস্য এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। তিনি এবং তার মিত্ররা রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করেন। রাষ্ট্রপতি সংসদে প্রবেশের আগেই অধিবেশন কক্ষে হট্টগোল শুরু হয়।

তাদের অভিযোগ—রাষ্ট্রপতি ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’। প্রশ্নটা সেখানেই- যে রাষ্ট্রপতির কাছেই তারা একসময় শপথ নিয়েছিলেন, সময়ের ব্যবধানে সেই রাষ্ট্রপতিই কীভাবে হঠাৎ করে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ হয়ে উঠলেন?

তখন কেন আপত্তি ছিল না?

২০২৪ সালের আগস্টের সেই দিনগুলোতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। একটি রক্তক্ষয়ী সংঘাত সদ্য শেষ হয়েছে। রাজপথে তখনও সংঘাতের স্মৃতি তাজা। কিন্তু সেই সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ ধরনের অভিযোগ খুব একটা শোনা যায়নি।

বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকাই তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে কেউ কেউ দাবি করছেন, তখন নাকি রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট থেকে ৮ই আগস্টের মধ্যে এমন কোনো ঘটনার স্পষ্ট উদাহরণ প্রকাশ্যে খুব একটা পাওয়া যায় না।

রাষ্ট্রপতির ভূমিকা ও পরবর্তী সময়

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। বহুল আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ও রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরেই আদেশ আকারে জারি করা হয়। সে সময় রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে ছাত্রনেতা বা উপদেষ্টাদের প্রকাশ্য আপত্তি দেখা যায়নি।

বরং যখন বঙ্গভবনের সামনে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছিল, তখনও বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতাদের তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

সাংবিধানিক বাস্তবতা

বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম অধিবেশনের শুরুতে এবং প্রতি বছরের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। সুতরাং সাংবিধানিক নিয়ম মেনেই রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ বা বর্জনের রাজনীতি অনেকের কাছে সাংবিধানিক দ্বৈততা হিসেবেই ধরা পড়ছে।

নতুন বিতর্কের সূত্র

রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে তার দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারও ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।

রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির এমন মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অনেকেই মনে করেন, সমালোচনার জেরে তাকে অপমান করা বা পদত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ

রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে এই উত্তেজনার পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। বর্তমান সংসদের মেয়াদ ২০৩১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। যদি এখন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয়, তাহলে তার মেয়াদ শেষ হবে ২০৩১ সালের মার্চে যে সময় সংসদ নাও থাকতে পারে। এতে সাংবিধানিক জটিলতার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারি দল হয়তো বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে কিছু সময়ের জন্য বহাল রাখতে আগ্রহী।

অন্যদিকে বিরোধী জোট রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল নিতে পারে। যেটা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের রাজনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।

রাজনীতির বাস্তবতা

সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে বিতর্ক নতুন কোনো তথ্যের চেয়ে বেশি প্রকাশ করছে রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনকে। যে রাষ্ট্রপতির কাছেই ছাত্রনেতারা শপথ নিয়েছিলেন, সময়ের ব্যবধানে এখন সেই রাষ্ট্রপতিই রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু তা আবারও মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক অবস্থান অনেক সময় নীতির চেয়ে পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করে।

Visited 27 times, 1 visit(s) today