বিডি ডাইজেস্ট প্রতিবেদন
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে প্রথম মামলার ঘটনা সামনে এসেছে। নিজেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক’ পরিচয়দানকারী এবং সম্প্রতি ছাত্রদলে যোগ দেওয়া রিদুয়ান সিদ্দিকী সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার মামলার বাদী হয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি দায়ের করা হয়। আদালতের বিচারক কাজী মিজানুর রহমান অভিযোগ গ্রহণ করে তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন–কে আগামী ৫ মের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে সরকার গঠনের প্রথম মাসেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা হওয়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
মামলায় আসামি করা হয়েছে চট্টগ্রামের সাতজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে।
তারা হলেন— চট্টগ্রাম প্রতিদিনের সম্পাদক হোসাইন তৌফিক ইফতিখার, দৈনিক যুগান্তরের চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, দৈনিক সমকালের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক নাসির উদ্দিন হায়দার, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি রতন কান্তি দেবাশীষ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব মহসিন কাজী, চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাধারণ সম্পাদক সবুর শুভ, চ্যানেল আই চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান চৌধুরী ফরিদ।
তাদের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫–এর ২৬(১) ও ২৬(২) ধারায় সাইবার স্পেসে ধর্মীয় বা জাতিগত উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব ধারায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অভিযোগকারী রিদুয়ান সিদ্দিকী সম্প্রতি ছাত্রদলে যোগ দিয়েছেন। গত ১৫ জানুয়ারি তিনি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রদলে যোগ দেন।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম–২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য (যার ফলাফল বর্তমানে আদালতের আদেশে স্থগিত) সরওয়ার আলমগীর এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন রুবেল।
যোগদানের সময় সরওয়ার আলমগীর তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করেন।
এর আগে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একটি বৈঠককে কেন্দ্র করে উত্তেজনার ঘটনাও সামনে আসে। গত ৫ মার্চ তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন–এর সঙ্গে এক বৈঠক চলাকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে কোতোয়ালী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন সাংবাদিক হোসাইন তৌফিক ইফতিখার। জিডিতে অভিযোগ করা হয়, রিদুয়ান সিদ্দিকী ও তার সহযোগীরা সংঘবদ্ধভাবে মব তৈরি করে পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর হামলার নেতৃত্ব দেন।
জিডিতে আরও বলা হয়, ঘটনার প্রতিবাদ করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয় এবং বিভিন্ন মাধ্যমে শারীরিক হামলার হুমকি দেওয়া হয়।
রিদুয়ান সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে এর আগেও সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
গত বছরের ১ জুলাই চট্টগ্রামের পটিয়ায় তার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের এক নেতাকে মব তৈরি করে থানায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। সেখানে পুলিশের সামনেই তাকে মারধরের ঘটনা ঘটে।
এ সময় নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে থানায় ঢোকার চেষ্টা হলে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। এতে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু জাহেদ মো. নাজমুন নূরসহ অন্তত চারজন পুলিশ সদস্য আহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব দখল নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনাতেও রিদুয়ান সিদ্দিকী ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।
সাংবাদিকদের দাবি, ওই সময় সমন্বয়ক পরিচয়ে তারা প্রেসক্লাব দখলে ভূমিকা রাখেন।
পরে সেখানে জুয়া ও হাউজি চালুর অভিযোগ ওঠে এবং প্রশাসনের নির্দেশে সম্প্রতি তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সেই ঘটনার জের ধরেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে।
সাত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা দায়েরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে দেশের সাংবাদিক সংগঠনগুলো। এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শহীদ উল আলম, সালাহউদ্দিন মো. রেজা, দেবদুলাল ভৌমিক এবং রিয়াজ হায়দার চৌধুরী।
এক যৌথ প্রতিক্রিয়ায় তারা বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের আমলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা উদ্বেগজনক।
তাদের দাবি, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা এই মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে এবং ঘটনাটির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাংবাদিক নেতারা বলেন, সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যথায় গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
