❐ জামিল হাসান
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল, আমেরিকার হামলা শুরু হওয়ার পর মার্চের ২ তারিখ ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। সেদিন বিপিসি চেয়ারম্যান দেশে ১ লক্ষ ৩৬ হাজার টন জ্বালানি আছে বলে জানান। এর পরই দেশ জ্বালানি সংকট নিয়ে মিডিয়া হুলুস্থুল শুরু করে দেয়।
১২-১৪ ঘন্টা লোডশেডিং দেওয়ার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ বিদ্যুৎমন্ত্রী টুকু দেশে লোডশেডিং শুরু হওয়ার “শুভ সংবাদ” জানান।
যুদ্ধের গতি প্রকৃতি, নিজেদের মজুদ এবং বাস্তব অবস্থা যাচাই-বাছাই ছাড়াই মার্চের ৩ তারিখ পেট্রোবাংলা থেকে তাড়াহুড়ো করে স্পট মার্কেট থেকে দুটি কার্গো ক্রয়ের জন্য দরপত্র ডাকার ঘোষণা দেয়, কিন্তু এতে কোনো প্রতিষ্ঠানই অংশ নেয়নি। বাজারের অস্থিতিশীলতার জেরে পিছু হটেন ব্যবসায়ীরা।
৪ তারিখ ফের নতুন করে দরপত্র আহবান করলে তাতে সাড়া দেয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংস্থা ভিটল এশিয়া ও গানভোর।
এর মধ্যে এক কার্গোর দাম পড়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ ডলারের বেশি, অন্যটির দর ২৪ ডলার বেশি। গত ২রা মার্চ দাম ছিল ১২ ডলারের নিচে। অর্থাৎ দ্বিগুণের বেশি দামে গ্যাস কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পেট্রোবাংলা।
জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ‘চড়া দামেই স্পট এলএনজি কিনছি আমরা। চার দিন আগের তুলনায় এখন দাম প্রায় আড়াই গুণ বেশি।’
এখন আসেন পরিস্থিতির সুযোগ কীভাবে নেওয়া হয়েছে।
এলএনজি সংকটের যে কথা বলা হয়েছিল, সেটা আসলে সঠিক নয়। ৩ তারিখ সংকটের দাবি তুলে যে টেন্ডার ডাকা হয়েছে, তখন কিন্তু ৪টি এনএনজি জাহাজ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কাতার থেকে রওয়ানা হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের পথে ছিল।
এলএনজি ট্যাংকার আল জাসাসিয়া ২১শে ফেব্রুয়ারি, আল গালায়েল ও আল জুর ২৪শে ফেব্রুয়ারি, লুসাইল ২৫শে ফেব্রুয়ারি কাতার এনার্জি থেকে এলএনজি লোড করে বন্দর ত্যাগ করে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই এই চারটি জাহাজ হুরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে গালফ অব ওমানে চলে আসে। ৬ তারিখ এলএনজি নিয়ে কাতার থেকে রওয়ানা হওয়া লেব্রেথাহ হুরমুজ অতিক্রম করে এখন আবুধাবির উপকূলে আছে। আগামী ১৫ তারিখ এই জাহাজ মহেশখালী পৌঁছাবে।
এই চারটি জাহাজ এলএনজি নিয়ে দেশের পথে আছে এই খবর কি পেট্রোবাংলার কাছে ছিল না? পেট্রোবাংলা কি জাহাজের স্থানীয় এজেন্ট ইউনি গ্লোবালের সাথে যোগাযোগ করে জাহাজের অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখেনি?
জাহাজের খোঁজ নিলেই জানা যেত জাহাজগুলি নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশের উপকূলে এসে পৌঁছাবে। এই পরিমাণ এলএনজি নিয়ে জাহাজ এলে অন্তত কিছুদিন সরবরাহ নিয়ে কোন সংকট থাকার কথা ছিল না। অন্তত কয়েক দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর স্পট থেকে কেনার জন্য টেন্ডার আহবান করা যেত।
এখন প্যানিকড হয়ে দ্বিগুণ দামে অতিরিক্ত ১০০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে, এটা কি রাষ্ট্রের অপচয় নয়? এই দায় কারা নিবে? কাদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ১১ ডলারের পণ্য ২৪/২৮ ডলারে কেনা হয়েছে? স্পট মার্কেটে আজকের তারিখ (৯ই মার্চ) পর্যন্ত প্রতি ইউনিটের দাম এখনো ২০ ডলারের ওপরে যায়নি। অথচ আমরা কিনেছি ২৪ আর ২৮ ডলার করে!
দেশে প্রতিমাসে ৮/৯ জাহাজ এলএনজি এনে এনজিতে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হয়। ২০২৪-২০২৫ সালে ১০৯ কার্গো এলএনজি এসেছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে ১১৫ কার্গো টার্গেট আছে। এর ৮২ কার্গো আসবে কাতার ও ওমান থেকে শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। বাকি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে কেনা হবে।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ৫৩ কার্গো এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়েছে। তালিকার প্রথমটি শেখ হাসিনা সরকারের শেষ কেনা এবং শেষটা বিএনপি সরকার প্রথম কেনা। বাকিগুলো কিনেছে ইউনূসের সরকার।
নতুন সরকারের প্রথম মাসেই জনগণের ১ হাজার কোটি টাকা হাওয়া হয়ে গেল! এখন বিকল্প কেমন লাগে আপনাদের?





