বিশ্লেষণ || ৭ই মার্চে জয় পাকিস্তান/জিয়ে পাকিস্তান/পাকিস্তান জিন্দাবাদ সমাচার

বিশ্লেষণ || ৭ই মার্চে জয় পাকিস্তান/জিয়ে পাকিস্তান/পাকিস্তান জিন্দাবাদ সমাচার
শেয়ার করুন

অচেনা একজন


জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য স্বাধীনতা বিরোধী চক্র সুযোগ পেলেই জিকির তুলে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলেছেন, এরপর আবার চুপ মেরে যায়। এদের কেউ কেউ বলে বঙ্গবন্ধু ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলেছেন, কেউ বলে ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছেন এবং কেউ বলে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলেছেন।

বছরের পর বছর ধরে একটা বিতর্ক চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে, বাট প্রমাণ হিসেবে তাদের পক্ষ থেকে কোন অডিও / ভিডিও রেকর্ড কিংবা দালিলিক প্রমান পেশ করা সম্ভব হয়নি এতো বছরেও। তবে অনেকের বিভিন্ন বক্তব্য থেকে আংশিক কথা তুলে এনে এই মিথ্যাকে সত্য প্রমাণের চেষ্টা অব্যাহত এখনো আছে।

উল্লেখ্য, ‘জয় পাকিস্তান’ ইস্যুতে ২০০৪ সালে সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকায় পর পর কয়েক সংখ্যায় বিতর্ক হয়েছিলো।

তখন বিএনপি’র তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণ শেষে আস্তে করে, বলেছিলেন- জয় পাকিস্তান।’ কেমন হাস্যকর কথা, লক্ষ লক্ষ মানুষের জনসভায় ৮/৯টা মাউথপিসের সামনে ‘আস্তে’ করে নাকি বলেছিলেন ‘জয় পাকিস্তান’ !!!

৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে স্বশরীর হাজির ছিলেন না কবি শামসুর রাহমান, অথচ তার লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘কালের ধুলোয়’র লিখা প্রমান হিসেবে নিয়ে চট্টগ্রামের জনৈক শফিকুল ইসলাম ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ পত্রিকায় চিঠি লিখে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা, বলে ছোট করে বলেছিলেন ‘জিয়ে পাকিস্তান’।

যদিও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘কালের ধুলোয়’তে ভুল লিখার জন্য কবি শামসুর রাহমান ২০০৪ সালের ৩০শে জুলাই ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ পত্রিকায় “ক্ষমাপ্রার্থী আমার ত্রুটির জন্যে” শিরোনামে একটি বক্তব্য লিখে তাঁর কাজের জন্য বিনয়ের সাথে ক্ষমা চেয়েছেন।

সেই বিতর্কের এক পর্যায়ে ২০০৪ সালের ১৬ই জুলাই ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ পত্রিকায় আলী যাকের বলেন, বঙ্গবন্ধু এমন কোনো কথাই বলেননি। আলী যাকের লিখেন

“আমি জানি না, ৭ই মার্চ ১৯৭১ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় কবি স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন কি না। ঐ জনসভায় আমি ছিলাম এবং আমার সঙ্গে আরো ৮-৯ জন বন্ধু ছিলেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, ঐ জনসভায় তার বক্তৃতা শেষে বঙ্গবন্ধু কেবল একটি স্লোগানই দিয়েছিলেন আর তা হচ্ছে- ‘জয় বাংলা’।

সোজা কথায় বললে, ৭ই মার্চের ভাষণের নিউজগুলো পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো, কিংবা ৭ই মার্চের ভাষণের অডিও, ভিডিও, টেক্সট তিন ভার্সনই সর্বত্র পাওয়া যায়। ইন্টারনেটেও এইসব সহজলভ্য। সবখানেই উল্লেখ করা আছে ভাষণ শেষ হয়েছে ‘জয় বাংলা’ দিয়ে, কোথাও ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বা ‘জয় পাকিস্তান’ এর উল্লেখ নেই।

আরেক চাক্ষুস স্বাক্ষী মনজুর আহমদঃ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক পাকিস্তান’ (পরবর্তীতে ‘দৈনিক বাংলা’) এর স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন মনজুর আহমদ। তিনি রিপোর্টার হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ কাভার করতে সেদিন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত ছিলেন। এবং তাঁর রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরদিন ‘দৈনিক পাকিস্তান’ এ ছাপা হয় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বিষয়ক প্রতিবেদন। তিনি ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০০৪ সালে স্মৃতিচারণ করেন স্মৃতিচারণ করেছিলেন (১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০০৪ইং): মনজুর আহমদ লিখেন,

“জনসভা ও বক্তৃতার বিবরণ সংগ্রহ করাই ছিল আমার এবং অন্যান্য সাংবাদিকের দায়িত্ব। এই গুরুদায়িত্ব পালনে চোখ কান সারাক্ষণ সজাগ রাখতে হয়েছে। সেই দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট করেই বলতে চাই, বঙ্গবন্ধুর ‘জয় পাকিস্তান’ আমরা কেউ শুনিনি। পরদিনের কোনো পত্রিকাতেই এর কোনো উল্লেখ নেই। বক্তৃতার পুরো নোট ছাড়াও আমাদের অনেকেই সে বক্তৃতা টেপ করেছিলেন। রাতে রিপোর্ট লেখার সময় সেই টেপ বাজিয়ে আমরা নোট মিলিয়ে নিয়েছিলাম। না, ‘জয় পাকিস্তান’ কোথাও ছিল না। ছিল না বলেই পরদিনের পত্র-পত্রিকার সুবিস্তৃত বিবরণীতে কিংবা ওই জনসভা সংক্রান্ত আরো অসংখ্য ছোট বড় প্রতিবেদনে এর কোনো উল্লেখও ছিল না।”

বলা বাহুল্য, বঙ্গবন্ধু ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন, তা বলার সময়কাল, প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিলো, ৭ই মার্চ নয়।

“জয় বাংলা’ স্লোগানের শুরুটা যেভাবে

লেখক,গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ এর ‘এই দেশে একদিন যুদ্ধ হয়েছিল’ নামের বই থেকে জানা যায় যে, ১৯৬৯ইং সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর ছিলো শিক্ষা দিবস, এর দুইদিন আগে ১৫ই সেপ্টেম্বর সর্বদলীয ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মধুর ক্যান্টিনে শিক্ষা দিবস পালনের প্রস্তুতি সভা আয়োজন করে। এই ছাত্রসভার নেতাদের ভাষণ পর্ব চলাকালে হঠাৎ করে জিন্না হলের ছাত্র আফতাবউদ্দিন আহমাদ চিৎকার করে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দিয়ে উঠেন। এরপর গলা মেলান ইকবাল হলের চিশতি শাহ হেলালুর রহমান। নতুন শ্লোগান, তাই সবাই একটি হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলো। বলা হয় সেটিই ছিলো প্রকাশ্যে প্রথম ‘জয় বাংলা’ ম্লোগান। এরপর থেকে বিভিন্ন সভায় জয় বাংলা শ্লোগানটি শোনা গেলেও মঞ্চে নেতারা তা বলেন নাই অনেকদিন পর্যন্ত।

১৯৬৯ এর ২৫শে মার্চ সামরিক আইন জারির পর দীর্ঘদিন দিন প্রকাশ্যে রাজনীতি বন্ধ ছিল।

১৯৭০ এর ১লা জানুয়ারী নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর ৪ঠা জানুয়ারী রবিবার পল্টনে প্রথম জনসভা করে আওয়ামী লীগ। সেই জনসভার মঞ্চ থেকে জয়বাংলা শ্লোগান কেউ না দিলেও সভা জুড়ে ‘জয় বাংলা’ লেখা অসংখ্য প্লাকার্ড ছিলো।�এর পরের রবিবার ১১ই জানুয়ারি ছিলো জামায়াতে ইসলামীর জনসভা। সেখানেও মুহূমু‌র্হ শ্লোগান উঠে ‘জয় বাংলা’। জয় বাংলার দাপটে হারিয়ে যায় জামায়াতের জনসভা। মারামারি লাগলে মারা যায় দুজন। পণ্ড হয় সভা।

এর পরের রবিবার ছিল পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি বা পিডিপির জনসভা। সেখানে মূল বক্তা ছিলেন নূরুল আমিন। তিনি বক্তৃতা দেওয়া শুরু করা মাত্রই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে মাঠ কাঁপায়। সবার হাতে ছিল বঙ্গবন্ধুর ছবি। এরপর মঞ্চ ছেড়ে পালিয়ে যান পিডিপির নেতারা।

আওয়ামী লীগ সে সময়ের রেসকোর্সের মাঠে প্রথম নির্বাচনী জনসভা করে ৭ই জুন। বক্তৃতা দেন বঙ্গবন্ধু। বক্তৃতা শেষ করেন এভাবে – ‘জয় সিন্ধু, জয় বেলুচিস্তান, জয় পাঞ্জাব, জয় সীমান্ত প্রদেশ, জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান।’ বলা হয়, এই প্রথম বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যে জয় বাংলা শ্লোগান দিয়েছিলেন। নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এরপর ১৯৭১ এর ৩রা জানুয়ারী রেসকোর্সের মাঠে নির্বাচিত সবার শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বঙ্গবন্ধু। জনতার উদ্দেশ্যে সেদিন বন্ধবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার দলের কেউ যদি বাঙলার মানুষের সাথে বেঈমানি করে, আপনারা তাকে জীবন্ত পুঁতে ফেলবেন।’ এইদিনও তিনি বক্তৃতা শেষ করেন জয় বাংলা ও জয় পাকিস্তান বলে।

পরেরদিন, ৪ঠা জানুয়ারী ছিলো ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। রমনা বটমূলে আয়োজিত অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মাহবুবুল হক। এই দিন বঙ্গবন্ধু জয় পাকিস্তান বলেননি, বলেছিলেন কেবল জয় বাংলা।�মহিউদ্দিন আহমেদ ৪ঠা জানুয়ারীর এই সভা নিয়ে আরও তথ্য দিয়ে লিখেছেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) বক্তৃতা শেষ করেন জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে। এদিন তিনি জয় পাকিস্তান বলেননি, এবং এরপর আর কোনোদিনও না।’

মহিউদ্দিন আহমেদ ৭ই মার্চে রেসকোর্সের মাঠেও উপস্থিত ছিলেন। তারও একটি বর্ণনা আছে বইটিতে। অর্থাৎ তিনি প্রত্যক্ষদর্শী।

একে খন্দকার ও শারমিন আহমেদ কর্তৃক সৃষ্ট মিথ্যাচার

সর্বশেষ বিতর্ক উস্কে দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক ভাষণের দিন রেসকোর্স ময়দানের না যাওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বাধিনায়ক এ কে খন্দকারে !!! প্রথমা প্রকাশনী থেকে ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইটিতে জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান শব্দ ব্যবহার করেছিলেন এ কে খন্দকার।

এই বই প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার রফিকুল ইসলাম, সাবেক সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমীর হোসেন আমু, সাবেক সাংসদ জাসদের মঈন উদ্দীন খান বাদল কঠোর ভাবে এমন ইতিহাস বিকৃতি তথা মিথ্যাচারের বিরোধীতা করেন।

এবং এই প্রসঙ্গে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে থাকা সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধু সাতই মার্চের ভাষণে জয় বাংলা বলেছিলেন। আমার মঞ্চে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। আমরা তো শুনলাম না বঙ্গবন্ধু “জয় পাকিস্তান” বলেছিলেন। এবং

সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমি সেখানে ছিলাম। বঙ্গবন্ধু জয় পাকিস্তান বলেননি। এখন নতুন নতুন করে বিকৃত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে।’

পরবর্তীতে ‘১৯৭১: ভেতরে বাইরে’ বইয়ের পরবর্তী সংস্করণে (২য় সংস্করণ) ওই বিতর্কিত অংশটুকু বাদ দেওয়ার কথা জানিয়ে রিপোর্টার্স ইউনিটি’তে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুঃখ প্রকাশ করে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন এয়ার ভাইস মার্শাল অবসরপ্রাপ্ত এ কে খন্দকার (বীর উত্তম)। তিনি বইটির ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লিখিত বিশেষ অংশ ও বইয়ের আরও কিছু অংশের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেন,

“… … … এই তথ্যটুকু যেভাবেই আমার বইতে আসুক না কেন, এই অসত্য তথ্যের দায়ভার আমার এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে কখনও ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দ দুটি বলেননি। তাই আমার বইয়ের ৩২ নম্বর পৃষ্ঠার উল্লিখিত বিশেষ অংশ সম্বলিত পুরো অনুচ্ছেদটুকু প্রত্যাহার করে নিচ্ছি এবং একই সঙ্গে জাতির কাছে ও বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।”

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কে খন্দকারের পক্ষে তার সহধর্মিণী ফরিদা খন্দকার বলেন, ‘‘এ বিষয়ে মতিউর রহমান সাহেবকে আমি অনুরোধ করেছিলাম আপনি কি বিষয়টি পড়ে দেখেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি পড়ি না, আমাদের লোক থাকে। তারা লেখার গ্রামার এবং বানান দেখে। এছাড়া আমরা খেয়াল করি না।’ তারপরও আমি চেষ্টা করেছিলাম সংশোধনের, কিন্তু কিছু লোক আমাকে করতে দেয়নি। আমি কোনও ঝগড়া-ঝাঁটির মধ্যে যেতে চাই না।’’

পরে সাংবাদিকদের চাপের মুখে তিনি বলেন, “তাজউদ্দীন আহমেদের পিএস মঈদুল হাসান, ড. জাফর উল্যাহ সহ বেশ কয়েকজন ছিলেন। তারা বেশ কিছুদিন পাহারা দিয়ে রেখেছিল যেন সংশোধন করতে না পারি। মঈদুল হাসান বলেছিল, ‘গুলি তো ছেড়ে দিয়েছো, এখন কি গুলির পিছে দৌড়াবা’।”

Visited 21 times, 1 visit(s) today