ইউনূস সরকারের আমলে জারিকৃত অধ্যাদেশ আমলে নিচ্ছে না বিএনপি সরকার

ইউনূস সরকারের আমলে জারিকৃত অধ্যাদেশ আমলে নিচ্ছে না বিএনপি সরকার
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে তাদের সংখ্যা এবং ভবিষ্যৎ।

বিভিন্ন সূত্র অনুসারে, এই সরকারের দায়িত্ব পালনকালে (২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় দেড় বছর) মোট ১৩২ থেকে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু সংস্কার-সংক্রান্ত, কিছু সংশোধনী এবং কয়েকটি নতুন আইনি কাঠামো তৈরির উদ্দেশ্যে প্রণীত।

বিএনপি-নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের আমলে এসব অধ্যাদেশের বেশিরভাগই আইনে রূপান্তরিত হচ্ছে না।

সংবিধান অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন (আগামী ১২ মার্চ) বসার ৩০ দিনের মধ্যে এগুলোকে আইনে পরিণত করতে না পারলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, অধিকাংশ অধ্যাদেশ বাতিলের পথেই রয়েছে, শুধু কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণকে যাচাই-বাছাই করে আইনে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

ইউনূস সরকারের আমলে জারি করা উল্লেখযোগ্য অধ্যাদেশসমূহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা:

অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো মূলত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ, জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত সুরক্ষা, প্রশাসনিক পরিবর্তন এবং মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিষয়ে কেন্দ্রীভূত ছিল। নির্দিষ্ট তালিকা প্রকাশ্যে পুরোপুরি না থাকলেও, বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ২০২৬: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের (‘জুলাই যোদ্ধা’) রাজনৈতিক প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি প্রদান। এতে আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে যাতে অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলা দায়ের না করা যায়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অধ্যাদেশ, ২০২৪: অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন, কার্যকাল এবং ক্ষমতা নির্ধারণ করে। এতে বলা হয়েছে যে সরকারের কোনো কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না এবং মেয়াদ নতুন সরকার গঠন পর্যন্ত।

সাইবার সিকিউরিটি অধ্যাদেশ, ২০২৫: সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত। এতে স্বাধীনতা সংক্রান্ত কিছু বিধান আছে যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি উঠেছে।

এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স প্রিভেনশন অ্যান্ড রিড্রেস অধ্যাদেশ, ২০২৫: জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত। এতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যদিও মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫: স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠনের জন্য। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে।

বয়সসীমা বাড়ানো সংক্রান্ত অধ্যাদেশ (২০২৪): সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের বয়সসীমা ৩০ থেকে ৩২ বছরে বাড়ানো।

ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা ও ন্যাশনাল ডেটা ম্যানেজমেন্ট অধ্যাদেশ (খসড়া): ডেটা গোপনীয়তা রক্ষা, যদিও রাষ্ট্রীয় ছাড়ের বিষয়ে সমালোচনা।

এছাড়া অনেক অধ্যাদেশ ছিল সংশোধনীমূলক, যেমন সিআরপিসি-ক্রপিসি সংশোধন, গ্রেপ্তারের পর ১২ ঘণ্টার মধ্যে পরিবারকে জানানো, অনলাইন জিডি ফাইলিং ইত্যাদি। সরকারের দাবি ছিল এগুলো সংস্কারের অংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের জন্য জরুরি।

তবে নতুন সরকারের অবস্থান স্পষ্ট—অধিকাংশ অধ্যাদেশকে বাতিলের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কারণ এগুলোকে ‘জরুরি পরিস্থিতি’ ছাড়া জারি করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যেগুলো রাখা হবে, সেগুলোর খসড়া অধিবেশনের আগেই চূড়ান্ত করা হবে। এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ‘সুপারসনিক’ গতিতে আইন প্রণয়ন নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রশ্নও উঠেছে।

Visited 41 times, 1 visit(s) today