মবের পৃষ্ঠপোষক উপদেষ্টারাই মব আতঙ্কে গৃহবন্দি, সরকারি বাড়ি ছাড়তে চাইছেন না কেউই

মবের পৃষ্ঠপোষক উপদেষ্টারাই মব আতঙ্কে গৃহবন্দি, সরকারি বাড়ি ছাড়তে চাইছেন না কেউই
শেয়ার করুন

❐ বিশেষ প্রতিবেদক


ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে একসময় ছিল তাদের দৃপ্ত পদচারণা। প্রতিশ্রুতির মঞ্চে উচ্চারিত হয়েছিল মানবাধিকার রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার। সেই সরকারের প্রধান ছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ইউনূস—যিনি দলমত-নির্বিশেষে নাগরিক অধিকার সুরক্ষার আশ্বাস দিয়েছিলেন বারবার। যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি এক শতাংশও। বরং বিশ্বজুড়ে ২০২৪-এর আগস্ট থেকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরম ক্ষুণ্ন হয়েছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে।

১৮ মাস পর যখন অন্তর্বর্তী সরকারের পর্দা নামল, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল অন্য এক চিত্র।

গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি জানায়— গত ১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সন্ত্রাস, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপ, সীমান্ত হত্যা—মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহুমাত্রিক ঘটনা ঘটেছে।

একই সুর নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে—মব সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদবিরোধী আইনের ব্যবহার, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার ও বিচারহীন আটকে রাখার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ।

সংখ্যাগুলো শীতল—কিন্তু তার ভেতরে লুকানো উত্তাপ প্রবল।

ইউনূস সরকারের আজ্ঞাবহদের মব সন্ত্রাসে দেশজুড়ে প্রায় প্রতিদিনই মানুষ মরছে যখন, তখন স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা একে মব সন্ত্রাস না বলে ‘ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’ আখ্যায় প্রশ্রয় দিয়েছেন, কখনো তার উপদেষ্টারা একে ‘প্রেশার গ্রুপ’ আখ্যা দিয়েছেন, কখনো ‘দেশে মব সন্ত্রাস বলে কিছু নেই’ উল্লেখ করে দায় সেরেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্ররা। আর এভাবেই মব সন্ত্রাসীরা নিরাপদ আশ্রয়-প্রশ্রয়-মদদ পেয়েছে।

চব্বিশের আগস্ট পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতায় হাজার হাজার মানুষ নিহতের ঘটনায় কার্যত নীরব প্রশ্রয় দিয়েছে ইউনূস সরকার।

১৭ মাসে হেফাজতে, সংঘর্ষে ও নির্যাতনে ৬০ জনের মৃত্যু। কারাগারে ১২৭ জন। মব সহিংসতার ৪১৩ ঘটনায় নিহত ২৫৯, আহত ৩১৩। এর বাইরে নদীগুলো হয়ে উঠেছিল লাশের ভাগাড়। গড়ে প্রতিদিন প্রায় অর্ধশত লাশ মিলেছে নদীগুলোতে।

আইনের শাসনের ভিত কেঁপে ওঠার এই পরিসংখ্যান যেন এখন ফিরে এসেছে ক্ষমতার প্রাক্তন অলিন্দে—এক অন্য আতঙ্ক হয়ে।

কারণ, এখন সেই মবের ভয়ের শঙ্কায় রয়েছেন কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টা। সরকারি বাসভবনের কঠোর নিরাপত্তা বলয় তাদের কাছে যেন শেষ আশ্রয়। বাইরে অনিশ্চয়তা, ভেতরে প্রহরী—এই দ্বৈত বাস্তবতায় তারা বাসা ছাড়তে ‘অনীহা’ প্রকাশ করেছেন।

অন্যদিকে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বার্তা স্পষ্ট—চলতি মাসেই ছাড়তে হবে তাদের বাসভবন। বিশেষ ক্ষেত্রে এক-দুই মাস সময় মিলতে পারে, তবে মার্চ বা এপ্রিল থেকে গুনতে হবে ভাড়া।

এদিকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জুলাই আন্দোলনের পর শপথ নিয়ে তিনি এখানেই ছিলেন। এখন তিনি ফিরবেন গুলশানের নিজ বাসভবনে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রও পাল্টেছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি-৩২ এর বাড়িটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধে সম্ভ্রমহারা ৬-৮ লাখ নারী যখন সমাজে অচ্ছুত ছিলেন, তখন তাঁদের পিতার নাম হিসেবে নিজের নামটি ব্যবহারের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, ঠিকানায় লেখা হয়েছিল ধানমন্ডি-৩২ এর বাড়িটি।

৭৫-এর ১৫ই আগস্ট এই বাড়িতেই তিনি সপরিবারে শহিদ হন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পৈতৃক বাড়িটি দান করে দেন দেশের জন্য। মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনকের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি হয়ে ওঠে বাঙালির জাতিসত্ত্বার স্মারক।

বাংলাদেশের এই ঠিকানায় ৫ই আগস্ট অগ্নিসংযোগ দিয়ে শুরু, পরে কয়েক দফা ভাঙচুর এবং গুঁড়িয়ে দেওয়া, সারাদেশে জাতির জনক, জাতীয় চার নেতা, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত ভাস্কর্য, ম্যূরাল, জাদুঘর, স্মারক ভেঙে-গুঁড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া, প্রতিটি জেলা-উপজেলা, ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কার্যালয় ধ্বংসসাধন, দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বাড়িঘরে ভাঙচুর-হামলা, মব সন্ত্রাসে হত্যাযজ্ঞ, তদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুটপাট, ভুয়া মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো, সেখানে নিরাপত্তা হেফাজতে হত্যা করা, দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বহিষ্কার, গ্রেপ্তার ও তাদের শিক্ষাজীবন চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়া, শিক্ষকদে চরমভাবে লাঞ্ছিত করা- সবই চলেছে ইউনূস সরকারের আমলে।

এসব ঘটনার অভিঘাত এখনো থামেনি। অভিযোগ, ক্ষোভ, পাল্টা অভিযোগ—সব মিলিয়ে বাতাস ভারী।

অন্যদিকে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের আবাসন চাহিদাও কম নয়। মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডের ২৪টি বাংলো ও ১২টি অ্যাপার্টমেন্ট দ্রুত সংস্কার করে বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আবেদন জমা পড়েছে ২১ জনের, অথচ মোট বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট ৩৭টি। বর্তমান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ৪৯ জন, উপদেষ্টা-বিশেষ সহকারী আরও ১০।

সংখ্যার অঙ্ক বলছে—সবাই জায়গা পাবেন না। আবাসন পরিদপ্তরের যুক্তি— “সবাই তো সরকারি বাসা চাইবেন না।”

কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—ক্ষমতার পালাবদলের এই অধ্যায়ে কে থাকবেন প্রহরার ভেতরে, আর কে ফিরবেন অনিশ্চিত নাগরিক জীবনে?

নাটকের মঞ্চে চরিত্র বদলেছে, সংলাপ বদলেছে— কিন্তু পর্দার আড়ালে অস্বস্তির যে সুর, তা এখনো থামেনি।

Visited 23 times, 1 visit(s) today