-
দলীয় প্রার্থী জেতাতে মরিয়া জামায়াত
-
শরিকদের মাঠে ফেলে রাজনীতি শেষ করার অভিযোগ
বিশেষ প্রতিবেদক
নির্বাচনী রাজনীতিতে ‘এক বাক্স নীতি’র আওতায় জামায়াতে ইসলামীর অনুপ্রবেশ ঘটলেও বাস্তবতায় শরিক দলগুলোর প্রতি তাদের আচরণ এখন গুরুতর প্রশ্নের মুখে। সাম্প্রতিক কয়েকটি আসনে ভোটার স্থানান্তর ও ভোটদানে অনীহার ঘটনায় স্পষ্ট হচ্ছেজামায়াত নিজের স্বার্থে শরিকদের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার কৌশল নিয়েছে।
ভোলা জেলার একটি এলাকায় দেখা যায়, সেখানে উপস্থিত এক জামায়াত সমর্থকের স্থায়ী বাড়ি ভোলা-৩ আসনে হলেও তিনি এবারের নির্বাচনে ভোটার হয়েছেন ভোলা-১ আসনে। স্থানীয়রা বলছেন, ভোলা-৩ আসনে জামায়াতের নিজস্ব কোনো প্রার্থী নেই, সেখানে রয়েছে তাদের শরিক দলের প্রার্থী। তবে ভোলা-১ আসনে জামায়াতের নিজস্ব প্রার্থী রয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের অভিযোগ, ভোলা-৩ আসনে জামায়াত সমর্থকদের কার্যত মাঠে দেখা যাচ্ছে না। এমনকি অনেকেই শরিক প্রার্থীকে ভোট দিতে আগ্রহী নন।
ভোলা-৩ আসনের এক শরিক দলের স্থানীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জামায়াত বলেছিল তারা আমাদের সঙ্গে থাকবে। হয়ত ভোটের দিন দেখা গেল- তাদের লোকই নেই। যারা আছে, তারাও ভোট দিতে অনাগ্রহী।”
এদিকে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান নির্বাচন করছেন ঢাকা-১৫ আসন থেকে। এই আসনে তাকে বিজয়ী করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জামায়াত সমর্থকদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করানো হয়েছে— এমন অভিযোগ উঠেছে একাধিক দলের পক্ষ থেকে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি শুধু ঢাকা-১৫ নয়; জামায়াত যেখানে ‘টপ প্রায়োরিটি’ ঠিক করেছে, সেখানেই তারা এই কৌশল প্রয়োগ করছে।
এক বিএনপি নেতা বলেন, “নিজেদের আমিরকে জেতাতে তারা যেভাবে ভোটার আমদানি করেছে, তা নজিরবিহীন। অথচ শরিকদের আসনে তারা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়।”
এদিকে চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে, যেখানে জামায়াত নিজস্ব প্রার্থী দেয়নি বরং শরিক দলকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছিল, সেখানে ভোটের মাঠে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য,জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি সেখানে নিষ্ক্রিয়। নির্বাচনী মিছিল, ভোটকেন্দ্র পাহারায় তাদের অংশগ্রহণ নেই।
একই অভিযোগ উঠেছে রাজশাহীর সীমান্তবর্তী একটি আসনেও। সেখানে শরিক দলের প্রার্থী থাকলেও জামায়াত সমর্থকদের বড় অংশ পাশের আসনেযেখানে তাদের নিজস্ব প্রার্থী আছে ভোটার হিসেবে স্থানান্তর হয়েছে বলে অভিযোগ।
বিএনপি প্রকাশ্যে জামায়াতের বিরুদ্ধে এই কৌশলগত অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলেছে।
দলটির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, “জামায়াত শরিকদের কথা বলে এক বাক্সে ঢুকেছে। কিন্তু বাস্তবে তারা শুধু নিজেদের প্রার্থীকে জেতাতে ব্যস্ত। শরিকদের ভোটের মাঠে একা ছেড়ে দিয়ে তাদের রাজনীতি ধ্বংস করার চেষ্টা করছে।”
তিনি আরও বলেন, “এটা যদি জোট রাজনীতি হয়, তাহলে এই আচরণ বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।”
জামায়াতের একাধিক শরিক দলের ভেতরেও চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এক শরিক দলের জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, “জামায়াত আমাদের ব্যবহার করেছে ঢাল হিসেবে। কিন্তু নির্বাচনের সময় বুঝেছি, তারা আমাদের পাশে নেই।”
তার মতে, এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে শরিক দলগুলোর অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই আচরণ হঠাৎ নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অপকৌশল। যেখানে নিজস্ব প্রার্থী নেই, সেখানে শরিকদের শক্তিশালী হতে না দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ আসনে ভোটার স্থানান্তরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
ভবিষ্যতে জোট রাজনীতিতে একক প্রভাব বিস্তার
এক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক বলেন, “জামায়াত শরিকদের দিয়ে মাঠ তৈরি করছে, কিন্তু ভোটের সময় মাঠটা নিজেরাই দখল করছে। এটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর রাজনৈতিক কূটচাল।”
তিনি বলেন,এক বাক্স নীতির শুরুতে অনেক দল ভেবেছিল—জামায়াত অন্তত শরিকদের ভোটব্যাংক হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে, তারা বরং শরিকদের রাজনীতির মাঠে রেখে ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব কমিয়ে দিচ্ছে।
এই কৌশলের পরিণতি কী হবে—জামায়াত শক্তিশালী হবে, না জোট রাজনীতিই ভেঙে পড়বে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ই দেবে।
