লাইফস্টাইল ডেস্ক
অনেক ঘুমাতে গিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকেন। তাদের মস্তিষ্ক কাজ করে যায়। তারা ঘুমাতে পারেন না। তারা ঘুমানোর চেষ্টা করতে থাকেন। এতে উল্টো মানসিক চাপ বাড়ে। এই চাপ মস্তিষ্কে উদ্বেগ তৈরি করে। শরীরও সজাগ থাকে। ফলে ঘুম আসে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীর ও মস্তিষ্ককে শিথিল করতে বৈজ্ঞানিক কৌশল কাজ করে। নিয়মিত অনুশীলন করলে ঘুম দ্রুত আসে। নিচে সম্পূর্ণ বিবরণ দেওয়া হলো।
দ্রুত ঘুমানোর ধারণা
ঘুম একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। ঘুম স্নায়ুতন্ত্র, হরমোন ও মস্তিষ্কের ক্রিয়ার সাথে যুক্ত। যখন মস্তিষ্ক শান্ত হয়, শরীর শিথিল হয়। তখন ঘুম আসে। কিন্তু উদ্বেগ, আলো, শব্দ, স্ক্রিন, দেরিতে ঘুমানো এবং মানসিক চাপ ঘুমে বাধা সৃষ্টি করে। এসব ক্ষেত্রে শ্বাসপ্রশ্বাস, পেশি শিথিলকরণ ও মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ ঘুম দ্রুত আনতে সাহায্য করে।
১০ সেকেন্ডে ঘুম: সামরিক পদ্ধতির পূর্ণ বিবরণ
এই পদ্ধতি মার্কিন নৌবাহিনীর প্রি-ফ্লাইট স্কুলে তৈরি হয়। এটি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পাইলটদের ঘুমের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই পদ্ধতি “Relax and Win: Championship Performance” বইয়ে উল্লেখ আছে। ছয় সপ্তাহের অনুশীলনের পর পাইলটরা দুই মিনিটের মধ্যে ঘুমাতে পারতেন। তারা গোলাগুলির শব্দেও ঘুমাতেন। তারা কফি পান করার পরও ঘুমাতে পারতেন।
এই পদ্ধতির ধাপগুলো হলো:
প্রথম ধাপ: পুরো মুখ শিথিল করা। মুখের পেশি ঢিলা করা। জিহ্বা শিথিল করা। চোখের চারপাশের পেশি শিথিল করা।
দ্বিতীয় ধাপ: কাঁধ নামিয়ে আনা। কাঁধের চাপ ছেড়ে দেওয়া। দুই হাত শরীরের পাশে ঢিলে রাখা।
তৃতীয় ধাপ: ধীরে শ্বাস ছেড়ে বুকে থাকা টান কমানো।
চতুর্থ ধাপ: উরু, পা ও পেশি শিথিল করা। পায়ের পাতায় চাপ যেন না থাকে।
পঞ্চম ধাপ: ১০ সেকেন্ড মন ফাঁকা রাখা।
একটি শান্ত দৃশ্য কল্পনা করা। যেমন নিস্তব্ধ হ্রদ। নরম ঘাস। নীল আকাশ। যদি মন দৌড়ায়, মনে মনে বলা: “ভাববে না। ভাববে না।” এই বাক্য ১০ সেকেন্ড ধীরে বলা। শেষে শরীর ভারী লাগে। চোখ স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয়। তারপর ঘুম আসে।
এই পদ্ধতি বসে ঘুমানোর ক্ষেত্রেও কাজে লাগে। তবে নিয়মিত অনুশীলন দরকার। ADHD বা তীব্র উদ্বেগ থাকলে সময় বেশি লাগতে পারে।
৬০ সেকেন্ডে ঘুম: শ্বাসপ্রশ্বাস ও পেশি শিথিলকরণ পদ্ধতি
এখানে দুটি কৌশল আছে।
১) ৪-৭-৮ শ্বাসপ্রশ্বাস পদ্ধতি
এই পদ্ধতি ধ্যান ও ভিজ্যুয়ালাইজেশনের সাথে সম্পর্কিত। নিয়মিত করলে এটি খুব কার্যকর হয়।
ধাপসমূহ:
- জিহ্বার ডগা ওপরের দাঁতের পেছনে রাখতে হয়
- হালকা শব্দ করে মুখ দিয়ে শ্বাস ছেড়ে দিতে হয়
- নাক দিয়ে ধীরে শ্বাস নিয়ে মনে মনে চার পর্যন্ত গোনা
- শ্বাস সাত সেকেন্ড ধরে রাখা
- এরপর আট সেকেন্ডে ধীরে শ্বাস ছাড়া
- একটানা চার বার করা
- শরীরে আরাম এলে থেমে ঘুমাতে দেওয়া
যাদের হাঁপানি বা COPD আছে, আগে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
২) প্রগ্রেসিভ মাংসপেশি রিলাক্সেশন (PMR)
এটি গভীর পেশি শিথিলকরণ। এতে প্রতিটি পেশি টানটান করা হয়। তারপর শিথিল করা হয়। এতে স্নায়ুতন্ত্র শান্ত হয়।
ধাপসমূহ:
- কপাল পাঁচ সেকেন্ড টানটান করা
- তারপর দশ সেকেন্ড শিথিল রাখা
- গাল টানটান করা। আবার ছেড়ে দেওয়া
- চোখ শক্ত করে বন্ধ করা। তারপর শিথিল করা
- ঘাড় ধীরে পেছনে তুলে ধরা। তারপর বালিশে স্বাভাবিকভাবে নামানো
- কাঁধ, বুক, উরু, পায়ের পেশি—সব ধাপে ধাপে করা
- যদি মাঝপথে ঘুম আসে, থামা যায়
এটি দীর্ঘদিন ধরে নিদ্রাহীনতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি।
১২০ সেকেন্ডে ঘুম: মানসিক বাধা দূর করার কৌশল
১) নিজেকে জেগে থাকার নির্দেশ দেওয়া
এটি পারাডক্সিকাল ইন্টেনশন। এখানে ঘুম জোর করে আনা হয় না। বরং নিজেকে বলা হয় “জেগে থাকবো।” এতে মানসিক চাপ কমে। ঘুম নিজে থেকেই আসে। গবেষণায় দেখা গেছে এটি অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর।
২) শান্ত দৃশ্য কল্পনা করা
এটি ইমেজারি ডিস্ট্র্যাকশন। এখানে মনকে শান্ত দৃশ্যে ব্যস্ত রাখা হয়।
উদাহরণ:
- ঝরনার শব্দ
- ভেজা মাটির গন্ধ
- নরম বাতাস
- পানির প্রতিধ্বনি
এতে চিন্তা থামে। ঘুম আসে।
৩) আকুপ্রেশার পয়েন্ট
গবেষণা সীমিত। তবুও কিছু পয়েন্ট সহায়ক হতে পারে।
- স্পিরিট গেট — কবজির নিচের খালি অংশ
- ইনার ফ্রন্টিয়ার গেট — কনুইয়ের দিকে টেন্ডনের মাঝে
- উইন্ড পুল — ঘাড়ের পেছন অংশ
হালকা চাপ দিয়ে বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করা হয়। শ্বাস ধীরে নেওয়া হয়। এতে শরীর শান্ত হয়।
- ঘুমের পরিবেশ তৈরি করা
- ঘুমের আগে কিছু অভ্যাস সহায়ক
- ঘড়ি চোখের আড়ালে রাখা
- শোবার আগে গরম পানিতে গোসল করা
- ঘর ঠান্ডা রাখা
- মোজা পরে শোয়া
- ১৫ মিনিটের হালকা যোগব্যায়াম করা
- মোবাইল দূরে রাখা
- ল্যাভেন্ডার বা ক্যামোমাইল ঘ্রাণ ব্যবহার করা
- রাতে দেরিতে ভারী খাবার না খাওয়া
ঘর যদি শব্দযুক্ত হয়, ব্ল্যাকআউট পর্দা ব্যবহার করা যায়। হোয়াইট নয়েজ মেশিন ব্যবহার করা যায়। ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করা যায়।
- ঘুমের স্বাস্থ্য বা স্লিপ হাইজিন
- ঘুম নিয়মিত করতে রুটিন দরকার
- একই সময়ে ঘুমানো
- একই সময়ে জাগা
- স্ক্রিনের ব্যবহার কমানো
- অন্ধকার ও নীরব ঘর রাখা
- ক্যাফেইন কমানো
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঘুম শরীর ও মনের জন্য অপরিহার্য। ঘুম স্মৃতি, মনোযোগ, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতার সাথে যুক্ত। তাই শ্বাসপ্রশ্বাস কৌশল, পেশি শিথিলকরণ, মানসিক প্রশান্তি ও সঠিক পরিবেশ—সবকিছু একসাথে কাজ করলে দ্রুত ও শান্ত ঘুম সম্ভব।
