❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
কারান্তরীণ অবস্থায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মৃত্যুর মিছিল ক্রমে বাড়ছেই। কারা-অভ্যন্তরে নির্মম নির্যাতন, চিকিৎসা না দিয়ে, মানবেতর অবস্থায় বন্দী করে রাখার ফলে গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে অন্তত ৬০-৭০ জন নেতাকর্মী এবং আওয়ামী লীগ সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় এবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলা যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক মিজানুর রহমান মিজান (৪৮)। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
আজ ৪ঠা অক্টোবর, শনিবার দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মিজানুর রহমান মিজান টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার কাশিল পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা যুবলীগের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রায় চার মাস আগে বাসাইল থানা পুলিশ তাকে উপজেলার নাকাছিম এলাকা থেকে আটক করে। পরে টাঙ্গাইল সদর থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাগারে থাকা অবস্থায় গত ১৭ই সেপ্টেম্বর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন মিজান। তাকে প্রথমে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরদিন তাকে ঢাকা মেডিকেলে স্থানান্তর করা হয়।
গত ২৯শে সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের জজ আদালতে তার জামিন শুনানি হয়। সে সময় মিজানের গুরুতর অসুস্থতার বিষয় উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় মেডিকেল কাগজপত্র জমা দিলেও আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। আগামী ৭ই অক্টোবর ছিল তার পরবর্তী জামিন শুনানির তারিখ।
তার পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের অভিযোগ, চিকিৎসা প্রদানে অবহেলার মাধ্যমে মিজানকে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
কারা সূত্র বলছে, একটি মামলায় কারাবন্দী যুবলীগ নেতা মিজানুর রহমান মিজান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসার জন্য কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
তবে তার এই মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে নারাজ তার পরিবার ও নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, মিজানুর রহমান কারাগারে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। তার ওপর অমানবিক নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হয়েছে কারাগারে। সেই সাথে চিকিৎসা সেবায় অবহেলা করা হয়েছে, যার পরিণতিতে তার মৃত্যু ঘটেছে।
স্বজনরা জানান, তার সারাশরীরে মারধরের দাগ রয়েছে। কালশিটে পড়ে গেছে হাতে-পায়ে। নির্যাতনের ক্ষতগুলো এখনও তাজা। এর অর্থ, একই ক্ষতের ওপর বারবার নির্যাতন চালানো হয়েছে।
কারাগারের ভেতরে সুরক্ষিত অবস্থায় কীভাবে কারো ওপর নির্যাতন চালানো হতে পারে, এ প্রশ্ন তোলেন পরিবারের সদস্যরা।
বাসাইল উপজেলা যুবলীগের পক্ষ থেকে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমাদের জনপ্রিয় নেতা মিজানুর রহমান মিজানকে কারাগারে রেখে হত্যা করা হয়েছে। এটি একটি ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।”
পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, মিজানকে যখন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হয়নি এবং তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কেও স্পষ্ট কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
টাঙ্গাইল জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে টাঙ্গাইল মেডিকেলে নেওয়া হয়। অবস্থা গুরুতর হলে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। মৃত্যুর বিষয়টি এখনো অজানা। মেডিকেলে যাওয়ার পর থেকে তিনি কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের আওতায় ছিলেন।”
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কারাবন্দী মিজানুরকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল এবং চিকিৎসকরা প্রটোকল অনুযায়ী তাকে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে।
এদিকে, মিজানুর রহমানের মৃত্যুর খবরে বাসাইল উপজেলায় তার সমর্থকদের মধ্যে শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বর্তমানে মিজানুর রহমানের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কারা হেফাজতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিভিন্ন তথ্য এখানে

