নেপালে জেন-জিদের অগ্নিকাণ্ড-ভাঙচুরকে অপরাধ আখ্যা কার্কির, বাংলাদেশে ড. ইউনূস দেন দায়মুক্তি

নেপালে জেন-জিদের অগ্নিকাণ্ড-ভাঙচুরকে অপরাধ আখ্যা কার্কির, বাংলাদেশে ড. ইউনূস দেন দায়মুক্তি
শেয়ার করুন
বিশেষ প্রতিবেদক

নেপালের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী সুশীলা কার্কি সম্প্রতি জেন-জি আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড এবং ভাঙচুরকে “দেশবিরোধী অপরাধমূলক কার্যকলাপ” হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই ঘোষণা নেপালের যুবকদের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে, যা সাম্প্রতিককালে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের সময় সহিংসতাসহ বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য ইউনূস সরকারের ইনডেমনিটি (দায়মুক্তির) নীতি নিয়ে তুলনামূলক প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। নেপালের জেন-জি আন্দোলন, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হয়, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অসমতা এবং সামাজিক মিডিয়া নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে যুবকদের বিদ্রোহ হিসেবে আবির্ভূত হয়।

এই আন্দোলনের ফলে প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলির সরকার পতন ঘটে এবং সুশীলা কার্কি, একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবং দুর্নীতিবিরোধী অভিযোক্তা, অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কার্কির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম দিকেই আন্দোলনকালীন সহিংসতার তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হয়।

রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে কার্কি স্পষ্ট করে বলেন, “জেন-জি আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড এবং ভাংচুর দেশবিরোধী অপরাধমূলক কার্যকলাপ।”

তিনি বলেন, সিংহ দুর্বার (সরকারি ভবন), সংসদ ভবন, সুপ্রিম কোর্ট, ব্যবসায়িক কমপ্লেক্স এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির উপর হামলার তদন্ত করা হবে।

আন্দোলনের সময় ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ২১ জন প্রতিবাদকারী, ৯ জন বন্দী, ৩ জন পুলিশ সদস্য এবং ১৮ জন অন্যান্য। আরও ১ হাজার ৩০০-এর বেশি আহত হয়েছে। কার্কি জোর দিয়ে বলেন, আন্দোলনের নামে সহিংসতা এবং লুটপাটকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যাবে না এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নেপালের সেনাবাহিনীও আন্দোলনের পর কার্ফিউ জারি করে বলেছে, “প্রতিবাদের নামে অগ্নিকাণ্ড, ভাংচুর, লুটপাট এবং ব্যক্তি-সম্পত্তির উপর হামলা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জেন-জি প্রতিবাদকারীরা ডিসকর্ড চ্যানেলে ভার্চুয়াল মিটিং করে কার্কিকে অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু তারা নিজেরাই সহিংসতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং শহর পরিষ্কারের কাজে অংশ নিয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই ঘোষণা তুলনামূলক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার সহিংসতা এবং হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি প্রদান করেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুসারে, আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের বা গ্রেপ্তার করা যাবে না। এতে আন্দোলনকালীন পুলিশ, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যা এবং সম্পত্তি ধ্বংসের মতো ঘটনাগুলোর জন্য কোনো তদন্ত বা বিচার হয়নি। আন্দোলনে ১,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দাবি।

আওয়ামী লীগের মতে, এই দায়মুক্তি “অপরাধীদের রক্ষা” করে এবং পুলিশের মনোবল ভেঙে দিয়েছে, যারা আন্দোলনের পরও হামলার শিকার হয়েছে। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বলেছে, “এটি গণতন্ত্রের কবরস্থান তৈরি করেছে এবং হত্যাকারীদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দিয়েছে।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, নেপালে কার্কির মতো কঠোর অবস্থান আন্দোলনের পর ন্যায়বিচারের পথ দেখায়, যেখানে বাংলাদেশে দায়মুক্তি নীতি অপরাধীদের উৎসাহিত করতে পারে। নেপালের প্রাক্তন বিচারপতি রাজেন্দ্র পন্ত বলেছেন, “এই অপরাধগুলোর তদন্ত ছাড়া দেশের স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।”

বাংলাদেশে জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে, কিন্তু ইউনূস সরকারের দায়মুক্তি একে জটিল করে তুলেছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশের আন্দোলনের ফলাফল যুবশক্তির ভূমিকা তুলে ধরলেও, ন্যায়বিচারের প্রয়োগে পার্থক্য দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। নেপালে কার্কির সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যখন বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত।

Visited 17 times, 1 visit(s) today