নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ২৩শে জুলাই, ২০২৫।
রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ী এলাকায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি ভবনে গত ২১ জুলাই ২০২৫ বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। এই ভবনটিতে প্রতিদিন ৭৮৩ জন শিক্ষার্থী ক্লাস করতো, যাদের বেশিরভাগই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী, যাদের ছুটি হয় দুপুর ১ টায়, আর ঐ ভবনে যুদ্ধবিমান আছড়ে পড়ে দুপুর ১ঃ১৩ মিনিটে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় অন্তত ৩১ জন নিহত এবং ১৬৫ জনের বেশি আহত হয়েছেন বলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই শিশু শিক্ষার্থী।
দুর্ঘটনার বিবরণ
২১ জুলাই দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে বিমানটি উড্ডয়নের পর যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাইলস্টোন স্কুলের ‘হায়দার হল’ নামক দোতলা ভবনের ছাদে আছড়ে পড়ে। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভবনে আগুন ধরে যায়, যার ফলে বহু শিক্ষার্থী দগ্ধ ও আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় ভবনটিতে প্রথম থেকে সপ্তম শ্রেণির ক্লাস ও কোচিং চলছিল। মাইলস্টোনের একজন প্রভাষক মো. রেজাউল হক জানান, “প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে ৩০ জনের মতো শিক্ষার্থী ছিল। দোতলায় উদ্ধার সম্ভব হলেও নিচতলার শিক্ষার্থীরা বেশি দগ্ধ হয়েছেন।
হতাহতের পরিসংখ্যান ও উদ্ধার তৎপরতা
আইএসপিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনায় ৩১ জন নিহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১৬৫ জন ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, যার মধ্যে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ২৮ জন ভর্তি। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের বেশিরভাগই শিশু, এবং অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়েছিলেন।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও দাবি
দুর্ঘটনার পরদিন ২২ জুলাই সকালে মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীরা দিয়াবাড়ী গোলচত্বরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। তারা ছয় দফা দাবি উত্থাপন করে, যার মধ্যে রয়েছে নিহত ও আহতদের সঠিক তালিকা প্রকাশ, ক্ষতিপূরণ প্রদান, ঝুঁকিপূর্ণ বিমান বাতিল ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতির সংস্কার। শিক্ষার্থীরা ‘বিচার চাই না, সন্তানের লাশ চাই’ ও ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তা অবরোধ করে। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার কলেজ পরিদর্শনে এলে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে পড়েন।
তথ্য গোপনের অভিযোগ
দুর্ঘটনার পর নিহত ও আহতদের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। কিছু সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী দাবি করেছেন, নিহতদের সংখ্যা ‘গুম’ করা হচ্ছে। এই অভিযোগের জবাবে মাইলস্টোনের শিক্ষক পূর্ণিমা দাস বলেন, “আমরা শিক্ষক, রাজনীতিবিদ নই। আমরা প্রতিটি শিক্ষার্থীর লাশ তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি।” তিনি গুজব না ছড়ানোর আহ্বান জানান। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় ক্লাস শেষ হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী চলে গিয়েছিল, তবে কোচিংয়ে প্রায় ১০০-২২০ শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও সমালোচনা
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তবে সরকারের তথ্য গোপন ও সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকরা বলছেন, ড. ইউনূস এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা দমনের চেষ্টা করছেন। তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্য গঠনের নামে বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করলেও, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
শোক ও প্রভাব
এই দুর্ঘটনার পর মাইলস্টোন স্কুল ২৭ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। স্কুলের মূল ফটক তালাবদ্ধ, এবং গেটের বাইরে অভিভাবক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড় দেখা গেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে একদিনের শোক পালন করা হয়, এবং এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তাদের সাম্প্রতিক জয় মাইলস্টোনে নিহতদের স্মরণে উৎসর্গ করেছে।
মাইলস্টোনের ৭৮৩ শিক্ষার্থীর ভবনে নেমে আসা এই বিপর্যয় জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। অভিভাবকরা এখনো হাসপাতালে সন্তানদের খোঁজ করছেন। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “দুই দিন আগেও যেখানে শিশুরা খেলাধুলা করতো, সেখানে এখন তালা ঝুলছে।” তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করলেও, নিহতদের সঠিক তালিকা ও দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে স্বচ্ছতার দাবি জোরালো হচ্ছে।
