নিজস্ব প্রতিবেদক | ৩০শে মে, ২০২৫
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর সারাদেশে চলমান নিপীড়নের ধারাবাহিকতায় গাজীপুরের মাওনায় ঘটেছে এক ভয়াবহ অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনা, যা আতঙ্কিত করেছে পুরো অঞ্চলকে।
ভয়াল সেই রাতের শিকার—ছাত্রলীগ নেতা আল-রিয়াদ আদনান অন্তর, যিনি মাওনা চৌরাস্তা থেকে অপহৃত হন ২৮শে মে, বুধবার রাত ৯টার দিকে। স্থানীয়দের চোখের সামনে তাকে ঘিরে ধরে ৩০-৪০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল। তারা উচ্চস্বরে বলে— “গাজীপুরে হাসনাত আব্দুল্লাহর উপর হামলাকারীকে ধরেছি, আওয়ামী লীগের দোসরকে ধরেছি!”
এই অপহরণকারীরা নিজেদের পরিচয় দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন (বৈছা)-এর কর্মী হিসেবে। অভিযোগ রয়েছে, এই সংগঠনের ছত্রছায়ায় একদল উগ্র সন্ত্রাসী দীর্ঘদিন ধরে দেশে অরাজকতা, চাঁদাবাজি, দখলদারি, এবং মব-নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর অনুসারীরা এই অপহরণ ও নির্যাতনের পর মুক্তিপণ বাণিজ্যে জড়িত বলে জানান অন্তরের স্বজনরা। তারা অন্তরকে তুলে নিয়ে যাবার সময় হাসনাতের ওপর হামলার অভিযোগে অন্তরকে আটক করা হয়েছে বলে স্লোগান দিয়েছিল।
অন্তরকে তুলে নিতে ব্যবহৃত হয় ৮-১০টি মোটরসাইকেল এবং কয়েকটি অটোরিকশা। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মাওনার ইয়াকুব আলি মার্কেটের পেছনের একটি মুরগির খামারের পার্শ্ববর্তী ফাঁকা মাঠে, যেখানে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। পরিবার ও স্বজনরা ছুটে এলেও অন্তরকে খুঁজে পাননি।
অন্তরের পরিবারের মোবাইলে আসে ফোন, ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। ফোনের ভেতরেই শোনা যায় অন্তরের আর্তচিৎকার, নির্যাতনের শব্দ। এক ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
ভয়ে ও আতঙ্কে স্বজনরা ২ লাখ টাকা এবং অন্তরের আইফোনের বক্স নিয়ে এমসি বাজারে হাজির হন। সেখানে বাইকে আসা তিনজন অপরিচিত লোক টাকা ও জিনিস নিয়ে যায়। আশ্বাস দেয়, “কিছুক্ষণ পর অন্তরকে ছেড়ে দেবে।”
কিন্তু সে আশ্বাস ছিল প্রতারণা। ভোর ৪টার দিকে আবার ফোন আসে— “৩০ লাখ না হোক, ১০ লাখের নিচে অন্তরকে ছাড়বো না। না দিলে লাশ নিয়ে যান!”
আত্মীয়রা প্রাণভিক্ষা করে আরও ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা জোগাড় করে আবার যান সেই গলিতে। টাকা নিয়ে গেলেও এরপর অপহরণকারীদের সঙ্গে আর যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ভোররাতে অন্তরকে পাওয়া যায়—হাত-পা বাঁধা, রক্তাক্ত, অচেতন অবস্থায়। অপহরণকারীরা তাকে ফেলে যায় বাড়ির সামনের মাঠে।
পরিবার ও স্থানীয়রা বলছেন—এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসারই ফল। “অন্তর আওয়ামী লীগের রাজনীতি করত বলেই কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি,” —বলেন অন্তরের চাচা।
স্থানীয় থানা বা প্রশাসন কোনো সহায়তা দেয়নি। অন্তর দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগের মানবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর, তিনি বিরোধী গোষ্ঠীর চোখে ছিলেন ‘টার্গেট’।
অপহরণ ও বর্বর নির্যাতনের এই ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছেন অন্তরের পরিবার, এলাকাবাসী ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা।
