জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অস্থিরতা: প্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশে নতুন উত্তেজনা

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অস্থিরতা: প্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশে নতুন উত্তেজনা
শেয়ার করুন

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ফলে গতকাল, রোববার, প্রশাসনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। কমিশন উপসচিব পদে পদোন্নতি নিয়োগে প্রশাসন ক্যাডার থেকে ৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য ক্যাডার থেকে ৫০ শতাংশ কর্মকর্তাকে নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায় এই বিধানটি ছিল প্রশাসন ক্যাডার থেকে ৭৫ শতাংশ এবং অন্য ক্যাডার থেকে ২৫ শতাংশ। এই সুপারিশে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং গতকাল তারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একইভাবে, ২৫টি অন্য ক্যাডারের জোট, আন্তক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদও কমিশনের এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তাদের আন্দোলন ঘোষণা করেছে।

এ ছাড়া, প্রশাসন ক্যাডারের বাইরের কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয়ভাবে বিবৃতি, কলমবিরতি, মানববন্ধন ও সমাবেশের মাধ্যমে তাদের অবস্থান জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে জন প্রশাসনে নতুন অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে যা প্রশাসনিক কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি সৃষ্টি করতে পারে, যদিও এটি সাময়িক বলে মন্তব্য করেছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।

এদিকে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়েছিল। এই সরকারের সাড়ে চার মাসের শাসনকালেও প্রশাসনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে চার মাসে ৫৩৭ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৩ জন সচিব, ১৭ জন গ্রেড-১ পদে পদোন্নতি, ১৩৫ জন অতিরিক্ত সচিব, ২২৮ জন যুগ্ম সচিব এবং ১৩৪ জন উপসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নাগরিক সেবা সহজ করা, সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের গতি বাড়ানো ও দুর্নীতি কমানোর ক্ষেত্রে তেমন নজর দেওয়া হয়নি।

ঢালাও পদোন্নতির প্রশ্ন

পদোন্নতির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেসব কর্মকর্তারা বঞ্চিত হয়েছিলেন, তারা পদোন্নতি পেয়েছেন। একইভাবে, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কিছু কর্মকর্তাও পদোন্নতি লাভ করেছেন। ঢালাও পদোন্নতির ফলে অনেক অদক্ষ কর্মকর্তাও পদোন্নতি পেয়ে গেছেন, যা প্রশাসনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ঘোষণা দেয় যে, বিগত সরকারের সময়ে চুক্তিভিত্তিক যে সব নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল করা হবে। এর পর শতাধিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়, তবে একই সময়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে চুক্তিভিত্তিক সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে অনেকেরই বিগত ১০ বছরে প্রশাসনের সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না।

আরেকদিকে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে জনপ্রশাসনে বঞ্চিত ৭৬৪ জন সাবেক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য একটি কমিটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে ১১৯ জনকে সচিব পদে পদোন্নতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, এসব বঞ্চিত কর্মকর্তার মধ্যে কিছু কিছু লোককে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে কর্মরত দুজন কর্মকর্তা জানান,

“অবসরে যাওয়ার এক দশক পর চুক্তিভিত্তিক সচিব পদে নিয়োগ দেওয়ার ফলে দুটি প্রধান সমস্যা দেখা দিচ্ছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন তারা প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত নন এবং প্রশাসনের কাজে অনেক পরিবর্তন হয়েছে, যার সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ না থাকার কারণে, তারা প্রশাসনকে গতিশীল করতে সক্ষম হচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, যারা বর্তমানে সচিব হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন, তারা এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করতে পারে।

এই নতুন পরিস্থিতি প্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, যা কার্যক্রমে ধীরগতির সৃষ্টি করতে পারে। তবে, কিছু সময়ের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে এবং সরকার নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
Visited 27 times, 1 visit(s) today