হাইকোর্ট ঘেরাও, আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের লাঞ্ছিত করলেন সমন্বয়ক-শিক্ষার্থীরা

হাইকোর্ট ঘেরাও, আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের লাঞ্ছিত করলেন সমন্বয়ক-শিক্ষার্থীরা
শেয়ার করুন

আদালত প্রতিনিধি:

দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ফ্যাসিবাদের দোসর বিচারপতিদের পদত্যাগ দাবিতে হাইকোর্ট ঘেরাও করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এর প্রেক্ষিতে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের ওপর চড়াও হন তারা। একপর্যায়ে সমন্বয়ক হাসনাতের হাতে আইনজীবীরা লাঞ্ছিত হয়েছেন, এমন ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

কিন্তু কেন এই ঘেরাও এবং সংঘর্ষ, জানতে একটু পেছনে ফেরা যাক।

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের জেরে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর দেশে যেন ‘মবের মুল্লুক’ চলছে। আইন ও বিচার বিভাগকে একরকম ‘জিম্মি’ করে ফেলা হয়েছে। এর ফলে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে গায়েবি মামলার মহোৎসব। কিডনি বা হৃদরোগে মৃতকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সহিংসতায় মৃত সাজিয়ে, মৃত ব্যক্তির নামে মামলা, কখনো হত্যা মামলায় খোদ মৃতকে আসামি করা, আবার দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা ব্যক্তিও মামলা থেকে নিস্তার পাচ্ছেন না।

 

মূলত সারাদেশে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর যত রাজনৈতিক ইউনিট রয়েছে, আর তাতে যত পদস্থ নেতা ও কর্মীবৃন্দ রয়েছেন, সবাইকে তালিকা ধরে ধরে আসামি করা হচ্ছে গায়েবি মামলায়। একেকটি মামলার এজাহারে দেখা যাচ্ছে পুরো গ্রামের যত আওয়ামীপন্থী লোকজন রয়েছেন, সবার নাম যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে বছবিচার ছাড়াই। অভিযোগ রয়েছে, অদৃশ্য নির্দেশ এসব গায়েবি মামলা করা হচ্ছে। এছাড়া মামলায় আসামি করা হবে, এমন হুমকি-ধমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেল করে অর্থ আদায়, গ্রেপ্তার বাণিজ্যেরও খবর পাওয়া যাচ্ছে।

এসব মামলার জেরে আওয়ামীপন্থী রাজনৈতিক কর্মীরা তো ‘দৌড়ের ওপর’ আছেনই, আওয়ামী লীগের আইনজীবী পরিষদের পেশাজীবীরাও আদালতে যেতে পারছেন না। দায়িত্ব পালন করতে পারছিলেন না বলে রাজনৈতিক মামলার শুনানিতে অংশগ্রহণ করতে পারছিলেন না। ফলে সেবাগ্রহীতারাও হয়রানির শিকার হচ্ছিলেন। এমন অরাজক অবস্থার প্রেক্ষিতে গতকাল ১৫ই অক্টোবর আদালত প্রাঙ্গনে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীরা রুখে দাঁড়ান। তারা আদালতে অবস্থান নেন চলমান স্থবিরত নিরসনের দাবিতে।

কিন্তু আওয়ামীপন্থী আইজীবীদের এই অবস্থান দেখে আদালত ঘেরাওয়ের উস্কানি দিয়ে বসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহসহ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। তারা গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের প্রতিহত করার লক্ষ্যে এবং আদালতে প্রবেশে বাধা দিতে আদালত ঘেরাওয়ের ঘোষণা দেন।

আজ বুধবার (১৬ই অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাইকোর্ট মাজার গেট এসে পৌঁছান তারা। সকাল সাড়ে ১০টা থেকেই রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হয় বিএনপি ও জামায়াত-শিবির কর্মীরা। তাদের সাথে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হিজবুত তাহরীরসহ আওয়ামীবিরোধী অন্যান্য সংগঠনগুলোও যোগ দেয়। তারা রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এসে অবস্থান নেন। এরপর সেখান থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে হাইকোর্টের দিকে রওনা হন। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এসময় তারা ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই—খুনি হাসিনার ফাঁসি চাই’ – ধারার অনেক স্লোগান দেন।

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আওয়ামী লীগের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারপতিদের পদত্যাগ দাবি করে আসছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। বিএনপি-জামায়াত-শিবিরপন্থী আইনজীবীরাও এই বিচারপতিদের পদত্যাগ দাবি করে আসছেন ৫ আগস্টের পর থেকে। গতকাল ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ হাইকোর্ট ঘেরাওয়ের আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন। তার প্রেক্ষিতেই আজকের এই সংঘর্ষ ঘটেছে বলে অভিমত নেটিজেনদের।

সারজিস তার পোস্টে লিখেন, ‘আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট বিচারকদের পদত্যাগের দাবিতে আগামীকাল (বুধবার) সকাল ১১টায় হাইকোর্ট ঘেরাও কর্মসূচি। যে যেখানে আছেন, চলে আসবেন। শকুনদের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। আগামীকাল আবার দেখা হবে রাজপথে।’ একই পোস্টের আরেক কমেন্টে সারজিস লিখেছেন, ‘যেখানে আমার শহীদ ভাই ও বোনদের মা-বাবার কান্না থামেনি, আহত ভাই-বোনদের ক্ষত শুকায়নি, সেখানে শকুনরা জেগে ওঠার সাহস করছে! এদের প্রতিহত করার জন্য আবারও রক্ত দিতে প্রস্তুত।’

একই পোস্ট দিয়েছেন আরেক সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি তার দেয়া পোস্টের কমেন্টে লিখেছেন, ‘যে লীগের হাতে হাজার হাজার ছাত্র ও নাগরিকের রক্ত লেগে আছে, দুই মাস না যেতেই তাদের কীভাবে দুঃসাহস হয় হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে খুনি হাসিনার নামে স্লোগান দেয়ার?’

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার বিএনপিপন্থী এক জুনিয়র আইনজীবী খলিল ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন একজন বিচারপতির সাথে। বিচারপতিকে অশালীন ভাষায় গালাগাল করে পদত্যাগ চেয়ে বসেন খলিল। এই জুনিয়র আইনজীবীর বিরুদ্ধে ৫ই আগস্ট গণভবনে ঢুকে সুপারি ও মাছ লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। এ সংক্রান্ত ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল সেসময়। বিচারকের সাথে অশোভন আচরণের দায়ে আদালত খলিলকে তিরস্কার করেন। যা মেনে নিতে না পেরে মঙ্গলবারই বিচারপতিদের অপসারণের দাবিতে প্রধান বিচারপতির কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা করেছেন বিএনপি-জামায়াতপন্থী আইজীবীরা।

বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে তারা সুপ্রিম কোর্ট ভবনের মূল ফটকের সামনে কিছুক্ষণ অবস্থান নেন। আইনজীবী নেতারা বৈঠক করেন প্রধান বিচারপতির সঙ্গেও। এসব ঘটনার মধ্যেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে হাইকোর্ট ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা এলো। যার প্রেক্ষিতে আজ আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের ওপর হামলা করা হয়।

বিচারপ্রত্যাশীদের অভিমত, আদালত ঘেরাও এবং আইনজীবীদের ওপর হামলার উদ্দেশ্য হচ্ছে মামলার শিকার আওয়ামী লীগ কর্মী ও আইজীবীরা যেন আদালত প্রাঙ্গনে আসতে না পারেন, মামলার শুনানিতে অংশ নিতে না পারেন এবং ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা।

Visited 21 times, 1 visit(s) today