আল জাজিরার প্রতিবেদন শেয়ার করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটসের প্রেসিডেন্ট কেরি কেনেডির।
বিশেষ প্রতিবেদক। ঢাকা, ৬ নভেম্বর, ২০২৬।
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও দমন-পীড়ন নিয়ে Human Rights Watch-এর উদ্বেগ;
আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন। আল জাজিরার প্রতিবেদন শেয়ার করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান কেরি কেনেডির।
বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে চলমান আন্দোলন দমনে পুলিশের বলপ্রয়োগ, লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপের ঘটনা সরকারের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নজর এড়াতে পারেনি। শ্রমিক আন্দোলনে সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে এবার সরাসরি উদ্বেগ জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত ৫ নভেম্বর প্রকাশিত ‘Bangladesh Labor Protests Turn Violent’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে HRW বলেছে, উচ্চ মজুরির দাবিতে আন্দোলনরত হাজার হাজার পোশাকশ্রমিককে ছত্রভঙ্গ করতে বাংলাদেশ পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করেছে। পাশাপাশি কারখানার মালিক ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ, কারখানা ভাঙচুর এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
HRW-এর ডেপুটি এশিয়া ডিরেক্টর মীনাক্ষী গাঙ্গুলি লিখিত এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সরকারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, পুলিশ কেবল প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক মাত্রায় বলপ্রয়োগ করতে পারে এবং সহিংসতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তৌফিকের মৃত্যু ও শ্রমিকদের ওপর হামলার বিবরণ
প্রতিবেদনে গত ৩ নভেম্বর নিহত পোশাকশ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাও তুলে ধরেছে HRW। তৌফিকের সঙ্গে থাকা এক সহকর্মীর বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, দুপুরের খাবারের পর কারখানায় ফেরার পথে তৌফিক আন্দোলনরত শ্রমিক এবং অন্য একটি কারখানার আন্দোলন দমনে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মাঝখানে পড়ে যান। পরে ওই সহকর্মী ফিরে তাকিয়ে তৌফিককে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভাড়া করা ব্যক্তিরা তৌফিককে নির্মমভাবে মারধর করেছিলেন।
শ্রমিকদের আন্দোলনে কারখানা মালিকপক্ষের নিয়োজিত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ ও হামলার অভিযোগও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটির প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে।
১২ হাজার ৫০০ টাকায় সংসার চলে না, বলছেন শ্রমিকরা
HRW-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোশাকশ্রমিকরা বর্তমান মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। ২০২৩ সালে নির্ধারিত বর্তমান মজুরি দিয়ে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে তাঁদের অভিযোগ।
প্রতিবেদনে ৩১ বছর বয়সী এক নারী সেলাই মেশিন অপারেটরের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর মাসিক বেতন ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ বাসাভাড়া ৬ হাজার টাকা এবং রান্নার গ্যাসের খরচ ২ হাজার ৩০০ টাকা। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ বহন করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
এই বাস্তবতা তুলে ধরে HRW বলেছে, শ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরির দাবি সমাধান না করে কর্তৃপক্ষ আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক বিরোধীদের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করছে।
আন্দোলনকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানোর প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন
HRW-এর প্রতিবেদনে আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করার সরকারি অবস্থান এবং শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
সংস্থাটি জানায়, ৩ নভেম্বর ঢাকা পুলিশ নাশকতার অভিযোগে সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ৩৩ জন সমর্থককে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল। অন্যদিকে, বিএনপির যুব সংগঠনের সদস্যদেরও আন্দোলনরত শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একই দিনে আশুলিয়ায় তিন শ্রমিক নেতাকে উসকানির অভিযোগে আটক করার খবরও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনে হাজার হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়টিও তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
আটক এক শ্রমিকের স্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে HRW জানায়, তাঁর স্বামী অল্প সময়ের জন্য আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, কোনো সহিংসতায় জড়িত ছিলেন না। তারপরও তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
কেরি কেনেডির কণ্ঠেও বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ শুধু HRW-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মানবাধিকারকর্মী ও রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটসের প্রেসিডেন্ট কেরি কেনেডিও বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হয়েছেন।
গত ৪ নভেম্বর নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে আল জাজিরার প্রতিবেদন শেয়ার করে তিনি লেখেন:
“Bangladesh is the world’s second-biggest garment exporter – but its monthly minimum wage for garment workers is barely equal to $100.”
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও এখানকার পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি মাত্র ১০০ ডলারের কাছাকাছি—এ বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রত্যেক মানুষের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এসব শর্ত পূরণ না হলে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকারও সবার রয়েছে।
কেরি কেনেডি আরও লেখেন, এমন পরিস্থিতিই একটি সরকারের মূল্যবোধ ও নাগরিকদের প্রতি তার অঙ্গীকারের পরিচয় দেয়। বাংলাদেশের জনগণের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে সম্মান ও নিশ্চিত করতে হবে।
তাঁর এই বক্তব্য বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সরকারের জন্য HRW-এর বার্তা: দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে
প্রতিবেদনের শেষাংশে HRW শুধু বাংলাদেশ সরকারকেই নয়, আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোকেও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সংস্থাটির মতে, বৈশ্বিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তি এমন হওয়া উচিত নয়, যা কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক নির্যাতনকে উৎসাহিত করে কিংবা শ্রমিকদের জীবনধারণের উপযোগী মজুরি প্রদানকে অসম্ভব করে তোলে।
HRW বলেছে, মজুরি নিয়ে আলোচনাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও দায়মুক্তির যে চক্র তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে তা বন্ধ করতে হবে।
উল্লেখ্য, শ্রমিকদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গত ১ নভেম্বর নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ৪ নভেম্বর বোর্ড নতুন বেতন কাঠামো ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার বিষয়ে সম্মত হলেও মজুরি কত বাড়বে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। এই শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। ফলে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত করা কেবল শ্রমিকদের স্বার্থের বিষয় নয়; দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।
সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকে রাজনৈতিক উসকানি বা নাশকতার সঙ্গে যুক্ত করার বক্তব্য থাকলেও শ্রমিকদের ওপর বলপ্রয়োগ, হামলা ও মৃত্যুর ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের নজরে এসেছে। HRW-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন এবং কেরি কেনেডির বক্তব্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বাংলাদেশের শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে। দেশের ভেতরে কোনো ঘটনা আড়াল করা সম্ভব হলেও আন্তর্জাতিক পরিসরে তার জবাবদিহির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া সহজ নয়।
তথ্যসূত্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন:
