কারাবন্দীদের বিপদ বা মুক্তির আশ্বাসে প্রতারক চক্রের ফাঁদ, সর্বস্বান্ত ১০ হাজারের বেশি বন্দীর স্বজন

কারাবন্দীদের বিপদ বা মুক্তির আশ্বাসে প্রতারক চক্রের ফাঁদ, সর্বস্বান্ত ১০ হাজারের বেশি বন্দীর স্বজন
শেয়ার করুন

অ্যাডভোটেক সাদিয়াতুল জান্নাত


সম্প্রতি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারকে কেন্দ্র করে যে মোবাইল প্রতারক চক্রের খোঁজ মিলেছে, তাদের কাজ করার নিখুঁত ও নিষ্ঠুর ধরণ শুনলে আপনি চমকে উঠবেন। এই চক্রটি কোনো সাধারণ পকেটমার বা আনাড়ি চোর নয়; অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সুপরিকল্পিতভাবে এরা ইতিমধ্যে ১০ হাজারেরও বেশি পরিবারকে ব্ল্যাকমেইল করে সর্বস্বান্ত করেছে।

ঘটনাটি আসলে কীভাবে ঘটে এবং এরা কীভাবে আপনার ঘরে বসে আপনার স্বজনের টাকা হাতিয়ে নিতে পারে, তা আরও স্পষ্ট করে নিচে তুলে ধরা হলো:

এই চক্রের সদস্যরা প্রতিদিন সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে চট্টগ্রাম আদালত চত্বর এবং জেল গেটে ঘোরাঘুরি করে। যখন কোনো বন্দীকে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানো হয় বা তাদের স্বজনরা ব্যাকুল হয়ে জেলের সামনে অপেক্ষা করেন, তখন প্রতারকরা কৌশলে পাশে এসে দাঁড়ায়। সান্ত্বনা দেওয়ার ছলে বা সাহায্য করার কথা বলে তারা বন্দীর নাম, মামলার ধারা এবং পরিবারের মোবাইল নম্বর জেনে নেয়।

এখানেই শেষ নয়। কারাগারের ভেতরে বন্দীরা যখন নিয়মানুযায়ী অফিশিয়াল ফোনে পরিবারের সাথে কথা বলেন, তখন তাদের কললিস্ট ও মোবাইল নম্বরগুলো এক শ্রেণীর অসাধু সহায়তায় জেলের ভেতর থেকেই কৌশলে বাইরে থাকা মূল প্রতারকদের কাছে পাচার হয়ে যায়।

নম্বর হাতে পাওয়ার পর প্রতারকরা সাধারণত গভীর রাত কিংবা কাকডাকা ভোরকে বেছে নেয়, কারণ ওই সময়ে মানুষের যৌক্তিক চিন্তা করার ক্ষমতা কম থাকে। তারা ফোন করে নিজেদের জেলের বড় কোনো কর্মকর্তা (যেমন—জেলার, ডেপুটি জেলার) কিংবা জেলের ভেতরের হাসপাতালের ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দেয়।

ফোনের ওপাশ থেকে তারা অত্যন্ত গম্ভীর ও জরুরি গলায় এমনভাবে কথা বলে যেন শুনলেই বুক কেঁপে ওঠে। যেমন— “আপনার ছেলে জেলের ভেতর অন্য কয়েদিদের সাথে মারামারি করে মাথা ফেটে গেছে, এখন প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে ওষধ নেই, এখনই ২০ হাজার টাকা বিকাশ না করলে তাকে বাঁচানো যাবে না।” অথবা “উপর মহলের সাথে কথা হয়েছে, আজ রাতেই জামিননামার খরচ বাবদ ৩০ হাজার টাকা দিলে কাল সকালে আপনার স্বামীকে জেল থেকে বের করে দেওয়া হবে।”

কারাগারে থাকা প্রিয় মানুষটির এই চরম সংকটের কথা শুনে যেকোনো মা, বাবা বা স্ত্রী মুহূর্তে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। গভীর রাতে দূর থেকে আসল সত্য যাচাই করার কোনো সুযোগ তাদের থাকে না। প্রিয়জনকে বাঁচানোর তীব্র তাগিদে তারা ধার-দেনা করে কিংবা নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বেঁচে প্রতারকদের দেওয়া বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠিয়ে দেন। টাকা পাওয়ার সাথে সাথেই অপরাধীরা সিম বন্ধ করে উধাও হয়ে যায়।

পড়ুন: ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে কারা হেফাজতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অস্বাভাবিক মৃত্যুর বিভিন্ন তথ্য এখানে

সকালে যখন পরিবারের মানুষ আসল সত্য জানতে পারেন, ততক্ষণে জমানো সব টাকা শেষ।

সম্প্রতি ডিবি পুলিশের বিশেষ অভিযানে এই চক্রের মূল হোতা বিপুল পরিমাণ মোবাইল সিম এবং ডিভাইসসহ ধরা পড়ায় এই চক্রের ভয়াবহ রূপটি সকলের সামনে এসেছে।

সবার জন্য সতর্কতা:

  • পরিষ্কার মনে রাখুন, বাংলাদেশে জেল বা কোনো সরকারি দপ্তর কখনো ব্যক্তিগত বিকাশ, রকেট বা নগদের মাধ্যমে টাকার লেনদেন করে না।
  • কারাগারের ভেতর বন্দী গুরুতর অসুস্থ হলে সরকারি নিয়মেই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়, এর জন্য রাতের অন্ধকারে ফোনে টাকা চাওয়া হয় না।
  • এই ধরণের কোনো ফোন আসলে প্যানিক না করে সাথে সাথে ফোন কেটে দিন। এরপর সরাসরি আপনার আইনজীবীর মাধ্যমে অথবা দিনের আলোয় সরাসরি কারাগার কর্তৃপক্ষের অফিশিয়াল নম্বরে যোগাযোগ করে বন্দীর খোঁজ নিন।

আপনার একটি সচেতনতামূলক শেয়ার হয়তো কোনো অসহায় মায়ের শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করতে পারে। ঘটনাটি জানুন এবং আপনার পরিচিত সবাইকে সতর্ক করুন।

Visited 3 times, 3 visit(s) today