‘সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দিয়েছি ধরে নেবেন না’- ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের কড়া জবাব

‘সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দিয়েছি ধরে নেবেন না’- ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের কড়া জবাব
শেয়ার করুন

এয়ারবাস ইস্যুতে ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কড়া জবাব |
বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশের গন্তব্য ইউরোপ, কূটনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক। ৮ অক্টোবর, ২০২৬। ঢাকা


বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা Airbus-এর কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি ঘিরে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে প্রকাশ্য বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যের জবাবে এবার কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের উপস্থিতিতে বুধবার Airbus-এর সঙ্গে চুক্তি সই অনুষ্ঠানে হুমায়ুন কবির বলেন, ফরাসি রাষ্ট্রদূত এমনভাবে ধরে নিয়েছেন যেন বাংলাদেশ ‘সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দিয়েছে’। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এবং ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক—দুটিই বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ ও সিদ্ধান্তের বিষয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আপনি কীভাবে যেন ধরে নেন, আমরা সবকিছু যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দিয়েছি।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ কী করছে, সেটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বিষয়; একইভাবে ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশ কী করছে, সেটিও বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।

তিনি আরও বলেন, দেশের উন্নয়ন করা বাংলাদেশের দায়িত্ব এবং যেখানে উপযুক্ত মনে হবে, সেখানেই ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ কাজ করবে।

হুমায়ুন কবির ফরাসি রাষ্ট্রদূতের কিছু মন্তব্যকে ‘অস্বস্তিকর ও ভুল বার্তা’ হিসেবেও বর্ণনা করেন।

ইউরোপ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই কঠোর বক্তব্যের পটভূমিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য ও বাণিজ্যিক অংশীদার। ইইউর সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৫৯ শতাংশের গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে রপ্তানির পরিমাণ ২১ বিলিয়ন ইউরোর বেশি হয়েছে।

বাংলাদেশের রপ্তানিতে ইউরোপীয় বাজারের এই অবস্থান তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সহযোগিতার মধ্য দিয়ে। ২০০১ সাল থেকে ইইউর ‘Everything But Arms’ বা EBA কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা পেয়ে আসছে। এই সুবিধার আওতায় অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছাড়া প্রায় সব পণ্যের জন্য এলডিসিভুক্ত দেশগুলোকে ইউরোপীয় বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়।

ইইউ নিজেই বলছে, এই বাণিজ্য সুবিধা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০১৯ সালে ইইউ-বাংলাদেশ যৌথ কমিশন জানিয়েছিল, ইইউ বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেক গ্রহণ করছিল।

অর্থাৎ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাতের জন্য ইউরোপীয় বাজার কেবল একটি সাধারণ বাণিজ্যিক বাজার নয়; এটি দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

সেই ইউরোপেরই এক রাষ্ট্রদূতের ‘ভালো পরীক্ষা’ মন্তব্য

এমন প্রেক্ষাপটেই গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ডিকাব) অনুষ্ঠানে Airbus ইস্যুতে বক্তব্য দেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলেট।

তিনি বলেন, ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব এগিয়ে নিতে Airbus-এর উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি

‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর ওপর জোর দিয়ে বলেন, বিষয়টি বর্তমান সরকারের জন্য একটি ‘ভালো পরীক্ষা’।

রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাংলাদেশ Airbus বেছে নিয়েছে ব্যবসায়িক ও কারিগরি কারণে, রাজনৈতিক কারণে নয়। একই সঙ্গে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশে সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন।

তাঁর বক্তব্যে Airbus-এর সম্ভাব্য ক্রয়কে কেবল একটি উড়োজাহাজ কেনার বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের বাইরে বাংলাদেশ-ইউরোপ দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের অংশ হিসেবেও তুলে ধরা হয়।

এরপরই বোয়িং-এ Airbus

ফরাসি রাষ্ট্রদূতের এসব মন্তব্যের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই Airbus-এর সঙ্গে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই করছে বাংলাদেশ। এর আগে সেপ্টেম্বরে মার্কিন কোম্পানি Boeing-এর কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।

ফলে Biman-এর বহর সম্প্রসারণে একই সময়ে Boeing ও Airbus—দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত সামনে এসেছে। সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে Biman-এর ২১টি অতিরিক্ত উড়োজাহাজ সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা উঠে আসে, যার মধ্যে Boeing ও Airbus উভয়ই ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে ফরাসি রাষ্ট্রদূতের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ ও ‘ভালো পরীক্ষা’ মন্তব্যকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কীভাবে দেখা হচ্ছে, সেটিই এখন প্রকাশ্য বিতর্কের বিষয়।

‘আমরা কারও সঙ্গে সম্পর্ক বেছে নিচ্ছি না’

ফরাসি রাষ্ট্রদূত অবশ্য একই অনুষ্ঠানে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ফ্রান্স বা ইউরোপ বাংলাদেশকে অন্য অংশীদারদের মধ্য থেকে কাউকে বেছে নিতে বলছে না।

তাঁর ভাষায়, ইউরোপ বাংলাদেশের সামনে ‘আমাদের অথবা তাদের’—এমন কোনো বিকল্প তৈরি করছে না; বরং অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়।

ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল প্রশ্ন শুধু Airbus কেনা নয়; বরং একটি সার্বভৌম দেশের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিদেশি কূটনীতিক কতটা প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে পারেন এবং সেই বক্তব্যের ভাষা কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রচলিত রীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেটিও আলোচনায় এসেছে।

‘বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশই নেবে’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—Biman-এর উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত কোনো দেশকে খুশি করার জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের ব্যবসায়িক প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

ইউরোপের বাজার বাংলাদেশের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার। ফলে Boeing কিংবা Airbus—কোনো একটি দেশের রাজনৈতিক পছন্দের ভিত্তিতে নয়, বরং উড়োজাহাজের দাম, প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, জ্বালানি দক্ষতা, রুট সক্ষমতা, যাত্রী ধারণক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক লাভ—এসব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলছে বাংলাদেশ।

আর এখানেই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য তৈরি হয়েছে—বাংলাদেশ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, কিন্তু কোনো অংশীদারের বাণিজ্যিক বা কৌশলগত পছন্দকে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে দেখতে চায় না।

বাণিজ্যিক অংশীদার, না কি কূটনৈতিক চাপ?

বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্কের পরিসর শুধু Airbus-এ সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রম অধিকার, জলবায়ু, অভিবাসন ও উন্নয়ন সহযোগিতা—বহু ক্ষেত্রে দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গভীরতা গত ৫০ বছরে আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে ইইউ নিজেই উল্লেখ করেছে।

তাই Airbus কেনার মতো একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের প্রকাশ্য বক্তব্য এখন স্বাভাবিকভাবেই বৃহত্তর বাংলাদেশ-ইউরোপ সম্পর্কের আলোচনায় চলে এসেছে।

একদিকে ইউরোপীয় বাজার বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় ভিত্তি এবং ইইউর দেওয়া দীর্ঘদিনের শুল্কমুক্ত সুবিধা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশও এখন ক্রমবর্ধমানভাবে তার বৈদেশিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে বহুমুখী করার চেষ্টা করছে।

ফলে Airbus কেনা বা Boeing কেনা—কোনো একটি সিদ্ধান্তের চেয়েও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশ কি তার বাণিজ্যিক প্রয়োজন অনুযায়ী অংশীদার বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারবে, একই সঙ্গে ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও অক্ষুণ্ন রাখতে পারবে?

বর্তমান বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য সেই ভারসাম্যেরই একটি প্রকাশ্য পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

Visited 41 times, 3 visit(s) today