নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ১৮ আগস্ট: ফুটপাতে বসে দিনভর ছোট পুঁজি নিয়ে সংসার চালানো হকারদের ওপর এবার নতুন করে আর্থিক চাপ চাপাতে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নতুন নির্ধারিত ফি কাঠামো অনুযায়ী, একজন হকারকে রেজিস্ট্রেশন করতে এককালীন গুনতে হবে ৫,০০০ টাকা, প্রতি বছর নবায়নের জন্য দিতে হবে ২,৫০০ টাকা, আর প্রতি মাসে ব্যবসা পরিচালনার জন্য গুনতে হবে আরও ৩,০০০ টাকা। অর্থাৎ প্রথম বছরেই একজন হকারকে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে প্রায় ৪৩,৫০০ টাকা, যা ছোট পুঁজির ব্যবসায়ীদের জন্য রীতিমতো অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতার দায় কার?
অর্থনীতিবিদ ও নগর-বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছেন, বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি ও উচ্চ আয়ের করদাতাদের কাছ থেকে যথাযথভাবে কর আদায় করতে না পারার ব্যর্থতা ঢাকতেই এবার সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে ফুটপাতের হকারদের। তাদের ভাষ্য, যেখানে বড় করফাঁকিবাজদের চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা ছিল, সেখানে প্রশাসনিকভাবে সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও সংগঠিত প্রতিরোধ ক্ষমতাহীন হকার সম্প্রদায়ের ওপরই রাজস্ব আদায়ের এই বোঝা চাপানো হচ্ছে।
একজন নগর অর্থনীতি বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ সামগ্রিক রাজস্ব আয়ের তুলনায় নগণ্য হলেও, এই উদ্যোগ প্রশাসনিকভাবে “রাজস্ব বাড়ানোর প্রচেষ্টা” হিসেবে দেখানো সহজ—অথচ প্রকৃত ফাঁকফোকর বন্ধ করার কঠিন কাজে হাত দেওয়া হচ্ছে না।
হকারদের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় একাধিক হকার সমিতির নেতারা এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাদের দাবি, দৈনিক আয়ের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে চাঁদা, স্থান ভাড়া ও অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খরচে চলে যায়। এর ওপর নতুন করে মাসিক তিন হাজার টাকা ব্যবসা পরিচালনা ফি যুক্ত হলে অনেক ছোট হকারের পক্ষে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।
একজন হকার নেতা বলেন, সরকার যদি প্রকৃতপক্ষে রাজস্ব বাড়াতে চায়, তাহলে বড় প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি বন্ধ করাই যৌক্তিক পথ—ফুটপাতের গরিব মানুষের পকেট থেকে টাকা তোলা কোনো টেকসই সমাধান নয়।
বিশেষজ্ঞদের মত
নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, হকারদের নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং শৃঙ্খলার মধ্যে আনা প্রয়োজনীয় হলেও, ফি কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের প্রকৃত আয়-ব্যয়ের চিত্র বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তাদের মতে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বৃহৎ পরিসরের কর ফাঁকি ও রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলার সদিচ্ছার অভাবই দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর এমন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার পেছনে মূল কারণ।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত অব্যাহত থাকলে ফুটপাতের অর্থনীতিতে জড়িত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা সংকটে পড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে শহুরে দারিদ্র্য ও অনানুষ্ঠানিক খাতের অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।
