“বিশ্বকাপে সঞ্জয় ‘আমাদের গর্ব’, কিন্তু দেশে থাকলে?”

“বিশ্বকাপে সঞ্জয় ‘আমাদের গর্ব’, কিন্তু দেশে থাকলে?”
শেয়ার করুন

. লুবনা ফেরদৌসী
শিক্ষক ও গবেষক।

 

সঞ্জয়কে বিশ্বমঞ্চে দেখে আমার ভালো লেগেছে। শুধু এজন্য না যে তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকার রঙ, সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার কিংবা নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তুলে ধরেছেন। বরং এজন্য যে তাঁর উপস্থিতি আমাদের সামনে ‘very uncomfortable question’ ছুঁড়ে দেয় and that is “বাংলাদেশ বলতে আমরা আসলে কাদের বুঝি?”

 

সঞ্জয় ফিফার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের প্রতীককে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে, আমরা গর্বে বুক ভরে বলি, “আমাদের ছেলে”। আমরা বিশ্বমঞ্চে বহুত্ববাদকে উদযাপন করি, কিন্তু ঘরের ভেতরে বৈচিত্র্যকে সন্দেহ করি। বিদেশে সাফল্য অর্জন করলে মানুষ আমাদের গর্ব হয়ে যায়; কিন্তু দেশে থাকলে তার নাম, ধর্ম বা খাদ্যাভ্যাস দিয়ে তাকে বিচার করা হয়।

এই সঞ্জয় যদি সিলেটের বা চট্টগ্রামের কোথাও বড় হতেন, এখানেই সংগীত করতেন, নিজের পরিচয় নিয়ে বাঁচতে চাইতেন, তাহলে কি আমরা তাঁকে একই উষ্ণতায় গ্রহণ করতাম?

 

নাকি তাঁকে প্রতিদিন প্রমাণ করতে হতো যে তিনি যথেষ্ট বাংলাদেশি? তাঁর নাম, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা পারিবারিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে তাঁকে শুনতে হতো, “এদের আসল দেশ তো ভারত”।

 

প্রশ্নটা কেবল সঞ্জয়কে ঘিরে না। এই প্রশ্ন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, জাতীয়তাবাদ এবং সংস্কৃতির ইতিহাসকে নিয়ে।

 

১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে পূর্ববঙ্গের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা ছিল বহুত্ববাদী। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, বিভিন্ন জাতিগত ও ভাষাগত সম্প্রদায় মিলেই এই ভূখণ্ডের সমাজ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্যায়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে। জনগণকে নাগরিক হিসেবে না, “হিন্দু” এবং “মুসলমান” হিসেবে কল্পনা করার রাজনীতি উপমহাদেশকে বিভক্ত করে।

 

দেশভাগের পর পূর্ববাংলা থেকে শুরু হয় ধীরে ধীরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দেশত্যাগ। ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু জনগোষ্ঠীর হার ছিল প্রায় ২২ শতাংশ। স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন আদমশুমারিতে সেই হার ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে বর্তমানে এক অঙ্কের ঘরে নেমে এসেছে। শুধুমাত্র জনসংখ্যাগত পরিবর্তন দিয়ে এই প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করা যায় না।

 

বিভিন্ন গবেষণা, যেমন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবুল বারকাত তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, শত্রু সম্পত্তি আইন/Enemy Property Act এবং পরবর্তীকালের অর্পিত সম্পত্তি আইন/Vested Property Act এর প্রভাব, সম্পত্তি অনিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ভঙ্গুরতা কয়েক দশক ধরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দেশত্যাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এই যে একটা জনগোষ্ঠী ক্রমাগত সংকুচিত হয়েছে। কখনও কি মনে হয়েছে, সুচিত্রা সেনের পূর্বপুরুষেরা কেন এই ভূখণ্ডে থাকতে পারলেন না? মিঠুন চক্রবর্তীর পরিবার কেন পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে স্থায়ী হলো? সৌরভ গাঙ্গুলীর পূর্বপুরুষেরা কেন আর এই বাংলার অংশ হয়ে থাকলেন না?

 

আমরা এমন কী ধরনের সমাজ তৈরি করেছি, যার মধ্যে একটা জনগোষ্ঠীর বড় অংশ ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করল যে এই দেশটি তাদের জন্য সমানভাবে নিরাপদ না?

আমার পুরোনো নানাবাড়ি ছিল পাশাপাশি তিনটি হিন্দু উচ্চবর্ণীয় পরিবারের বাড়ির একটি। খুব সুন্দর জমিদার বাড়ির গম্বুজ গুলোর কারুকাজ আমাকে মুগ্ধ করতো। আমার প্রিয় ছোটবেলার স্মৃতি।শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা সবাই ভারতে চলে যায়। পরে আমার নানা এবং তাঁর আত্মীয়রা সেই বাড়িগুলো কিনে নেন। শুনে অবাক লাগতো এতো আলিশান দালান কোঠা ছেড়ে চলে যায় নাকি মানুষ! এখন ভাবি কত কষ্ট নিয়ে ওরা চলে গেলো।

 

ছোটবেলায় নানাবাড়িতে গিয়ে ঘরের দেয়ালের ছোট ছোট কোটরগুলো দেখে আমি অবাক হতাম। জিজ্ঞেস করতাম, এগুলো কী? আমাকে বলা হতো, এখানে আগে মূর্তি রাখা হতো। নানারা সেখানে কোরআন শরীফ রাখতেন পরবর্তীতে।

 

সেই শিশুমনে ধর্মের এই সহাবস্থানকে দেখে আমার মনে হয়েছিল, তোমরা প্রার্থনা ভিন্নভাবে করো ঠিকই, কিন্তু ভিন্ন নামে একই স্রষ্টাকেই স্মরণ করো। তাহলে এত ভয় কেন? এত ছোট করা, অপমান করা, একে অপরের বিশ্বাসকে নিয়ে এত তাচ্ছিল্য কেন?

 

আমরা বাংলাদেশের ওপর একচ্ছত্র ownership নিয়ে খুব সহজেই বলে ফেলি, “আরে, ওরা তো ওদের দেশ ভারতে চলে গেছে”, “এটাই তো স্বাভাবিক”। কিন্তু খুব কমই নিজেদের জিজ্ঞেস করি, কেন গেল?

 

মানুষ জন্মভূমি সহজে ছেড়ে যায় না। শত শত বছরের ভিটেমাটি, পূর্বপুরুষের কবর, স্মৃতি, সাংস্কৃতিক শিকড়, ভাষা, নদী, উৎসব এবং প্রতিবেশীকে মানুষ তখনই ছেড়ে যায়, যখন সে অনুভব করে যে তাকে বারবার নিজের অস্তিত্বের বৈধতা প্রমাণ করতে হচ্ছে।

 

আর এখানেই ধর্মীয় মৌলবাদ এবং পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য।তারা শুধু ভোটব্যাংক তৈরি করে না; তারা জাতীয় কল্পনাকেও সংকুচিত করে। ‘ভালো বাংলাদেশি’ হওয়ার একটিমাত্র ছাঁচ তৈরি করে দেয়। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতি হয়ে ওঠে ‘জাতীয় সংস্কৃতি’, আর বাকিরা হয়ে যায় শর্তসাপেক্ষ নাগরিক। তাদের নাগরিক পরিচয় গৌণ হয়ে যায়, সংখ্যালঘু পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে। তাদের দেশপ্রেম ধরে নেওয়া হয় না, প্রমাণ করতে হয়।

 

কিন্তু এই প্রক্রিয়া একটি পুরো জাতিকেই দরিদ্র করে। কারণ সংস্কৃতি তখন আর সৃষ্টিশীল বিনিময়ের জায়গা থাকে না, সেটা পরিচয় পাহারার প্রকল্পে পরিণত হয়। শিল্পীরা আত্মনিয়ন্ত্রণ শিখে যায়। চলচ্চিত্র নির্মাতারা ভাবেন কোন দৃশ্য কাউকে ক্ষুব্ধ করবে। লেখকরা ভাবেন কোন বাক্য বিপজ্জনক হতে পারে। সংগীতশিল্পীরা ভাবেন কোন সুর অতি ভারতীয় বা অতি পাশ্চাত্য বলে অভিযুক্ত হবে। নৃত্যশিল্পীরা ভাবেন তাঁদের শিল্প আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না।

 

আমি এমন কম্পোজারকেও চিনি, যিনি মূলধারার সংগীতে পূজার কোনো অনুভূতি, আচার বা সাংস্কৃতিক প্রতীক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মৌলিক সুর তৈরি করেছিলেন, কিন্তু পরে গণসমালোচনার ভয়ে সেটি বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন। অথচ আমরা যখন বলিউডের গানে “শুকরানাল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ” শুনি, তখন খুশি হয়ে যাই, আনন্দের সঙ্গে শেয়ার দিই, প্রশংসা করি। সবজায়গায় আমাদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড।

 

একটা সমাজে যখন শিল্পকে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়, তখন মৌলবাদীরা জিতে যায়। সঞ্জয়ের পোশাকের হাতায় আঁকা রয়েল বেঙ্গল টাইগার তাই কেবল নান্দনিকতা না ; সেটা রাজনৈতিক প্রতীকও। যেটার message আমি যেভাবে পাঠ করি তা হলো, বাংলাদেশকে একমাত্রিক পরিচয়ে বন্দি করা যাবে না। বাংলাদেশ মানে খালি ধর্মীয় পরিচয় না ; বাংলাদেশ মানে সুন্দরবন, নদী, সংগীত, ভাষা, লোকজ ঐতিহ্য, বহুত্ববাদ, মিশ্রতা এবং সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতা।

 

সঞ্জয়কে নিয়ে আমার সবচেয়ে বড় অনুভূতি গর্ব না বরং আত্মসমালোচনা। একটা সমাজে যদি তার নাগরিকদের ধর্ম দিয়ে মাপা হয়, তবে সেই সমাজ থেকে শিল্প হারায়, কল্পনাশক্তি হারায়। যে সমাজ বৈচিত্র্যকে ভয় পায়, সে সমাজ নিজেরই সম্ভাবনাকে নির্বাসনে পাঠায়।

 

একদিন কি আমাদের সাহস হবে এই প্রশ্নটি সত্যিই করার, বাংলাদেশ থেকে কারা চলে গেছে, এবং কেন তাদের চলে যেতে হয়েছিল?

 

 

 

Visited 12 times, 1 visit(s) today