মালেক ইস্যুতে তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে জামায়াত-শিবিরের নির্জলা মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচন

মালেক ইস্যুতে তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে জামায়াত-শিবিরের নির্জলা মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচন
শেয়ার করুন

আরিফ ইশতিয়াক


তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুর পর থেকে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা ভয়াবহ মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছে। তারা দাবি করছে, শিক্ষানীতি বিষয়ক একটি বক্তৃতার জন্য ছাত্র সংঘের নেতা আব্দুল মালেক হত্যার শিকার হয়েছে এবং এই হত্যা করেছেন তোফায়েল আহমেদ। জামায়াত-শিবিরের এই দুটি দাবিই যে পরিপূর্ণ মিথ্যাচার তা তৎকালীন সময়ের পত্রিকার সংবাদগুলো দেখলেই বোঝা যায়।

আব্দুল মালেক ১৯৬৯ সালের ১২ই আগস্ট ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্র সংঘের সংঘর্ষে আহত হয়। উল্লেখ্য যে, এই সংঘর্ষের সূচনা ছাত্র সংঘই করেছিলো, যদিও পরে শক্তিতে পারেনি। ১৯৬৯ সালের ১৩ই আগস্ট আজাদ পত্রিকা এ ঘটনার বিবরণে লিখেছে:

‘গতকাল সকাল ১১ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে খসড়া শিক্ষানীতি সম্পর্কে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ডাকসুর সহ-সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সভা শুরু হয়।

সভার প্রথম বক্তা জনাব শামসুদ্দোহা নয়া শিক্ষানীতির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দান করিতে থাকিলে এক পর্যায়ে কিছু সংখ্যক ছাত্র (মালেক ও ছাত্র সংঘের নেতারা) একযোগে দাঁড়াইয়া পড়ে এবং বিভিন্ন ধ্বনি করিয়া বক্তার মতামতের প্রতিবাদ জানায়। এই সময় সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমেদ সকলের প্রতি শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান এবং প্রতিবাদমুখর ছাত্রদেরও বক্তব্য পেশ করার সুযোগ দানের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু গোলযোগ ক্রমেই বাড়িতে থাকে এবং এল পর্যায়ে কিছু সংখ্যক ছাত্র (মালেক ও ছাত্র সংঘের নেতারা) দৌড়াইয়া মঞ্চে আরোহণ করিয়া মঞ্চের টেবিল চেয়ার তচনচ করিয়া দেয়।

সেমিনারে উপস্থিত দর্শকগণ এই সময় দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া এদিক ওদিক ছুটাছুটি করিতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে হলের মধ্যে বেদম চেয়ার ছোড়াছুড়ি শুরু হয় এবং একইভাবে প্রায় আধাঘন্টা গোলযোগ চলার পর উভয়পক্ষই হলত্যাগ করিয়া বাহিরে চলিয়া আসে। এই সময় হলের সমস্ত চেয়ার-টেবিল লণ্ড ভণ্ড অবস্থায় দেখা যায়। কয়েকটি চেয়ারে রক্তের দাগও লক্ষ্য করা যায়। এই চেয়ার নিক্ষেপের মধ্যে ঢাকায় জনৈক সাংবাদিক এবং একজন ছাত্রীও সামান্য আহত হন।

এদিকে প্রতিবাদমুখর ছাত্ররা (মালেক ও ছাত্র সংঘের নেতারা) আবার বাহিরে আসিয়া চেয়ারের হাতল, ভাংগা কাঠ প্রভৃতিতে সজ্জিত হইয়া আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে এবং দ্বিতীয় বর্ষ রাজনীতির ছাত্র সুলতানের মাথা ফাটাইয়া দেয়। এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে অপর দল হাতের কাছে প্রাপ্ত হাতিয়ার লইয়া প্রতিবাদকারী ছাত্রদের ওপর ঝাঁপাইয়া পড়ে এবং তাহাদের অনেককে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মধ্যে ধরাশায়ী করিয়া ফেলে। এই পর্যায়ে প্রতিবাদকারী দল (মালেক ও ছাত্র সংঘের নেতারা) উর্ধশ্বাসে রেসকোর্স ময়দানের দিকে দৌড়াইতে থাকিলে অপরপক্ষ তাহাদের তাড়াইয়া লইয়া যায় এবং অনেককে রেসকোর্স ময়দানে প্রহার করিয়া ধরাশায়ী করে। প্রতিবাদকারী ছাত্ররা (মালেক ও ছাত্র সংঘের নেতারা) আত্মরক্ষার্থে রেসকোর্সের দিকে দৌড়াইবার সময়ও অনেকের মাথায় ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের চেয়ার পরিলক্ষিত হয়।

প্রতিবাদমুখর ছাত্ররা পলায়ন করিলে জনাব তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে আবার আলোচনা সভা শুরু হয়।

এই পর্যায়ে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনার পর প্রস্তাব পাশ করিয়া সভার সমাপ্তি ঘটে। ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের এই গোলযোগে আহত হইয়া যে ৬ জন ছাত্র হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছেন তাহারা হইতেছেনঃ (১) জনাব আব্দুল মালেক, (২) জনাব আব্দুর রব, (৩) জনাব নাসিরুল ইসলাম, (৪) জনাব শামসুল হুদা, (৫) জনাব মোঃ ইদ্রিস ও জনাব মোঃ ইসমাইল। ইহাদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তির অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক বলিয়া জানা গিয়েছে। অন্যান্যদের অবস্থা উন্নতির দিকে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল হইতে আরও ১০ ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছাড়িয়া দেওয়া হয়। ইহা ছাড়াও একজন ছাত্রসহ অন্যুন ৩৪/৩৫ ব্যক্তি কমবেশী আহত হয়।’

উল্লিখিত সংঘর্ষে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ দিন পরে, অর্থাৎ ১৯৬৯ সালের ১৫ই আগস্ট আব্দুল মালেক মারা যায়।

আব্দুল মালেকের মৃত্যুর পর ডাকসুর পক্ষ থেকে তোফায়েল আহমেদ, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং পৃথকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শোকাবার্তা জানান। ১৯৬৯ সালের ১৭ই আগস্ট আজাদ পত্রিকার একটি সংবাদের শিরোনাম ছিলো— আবদুল মালেকের মৃত্যুতে সর্ব্বত্র শোকের ছায়া। এই সংবাদের উল্লেখযোগ্য অংশ হলো:

১.
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের পক্ষ হইতে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে জনাব আবদুল মালেকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করিয়া বলা হয় যে, ১২ আগস্টের সেমিনারে একটি বিশেষ মহলের ইঙ্গিতে কিছু সংখ্যক ছাত্র গোলযোগ সৃষ্টি করিলে উহারাই দূর্ভাগ্যজনক পরিণতি হিসেবে মালেকের মৃত্যু ঘটে। আমরা তাহার আত্নার মাগফেরাত কামনা করিতেছি ও তাহার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাইতেছি।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন জনাব তোফায়েল আহমেদ, শামসুদ্দোহা, জনাব নুরুল ইসলাম, আ স ম আব্দুর রব, মোস্তফা কামাল হায়দার ও মাহবুব উল্লাহ।’

২.
পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সদস্যদের অনুষ্ঠিত এক শোক সভায় জনাব আবদুল মালেকের এন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়৷

জনাব তাজুদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা ও তাহার শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয়।’

৩.
‘আবদুল মালেকের অকাল মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ, শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন ও মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।

যে অবাঞ্ছিত ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া এই করুণ পরিণতি ঘটিয়াছে, ভবিষ্যতে উহার পুনরাবৃত্তি যাহাতে না ঘটে তাহার প্রতি সতর্ক থাকিবার জন্য তিনি সকল মহলের প্রতি আবেদন জানান।’

আব্দুল মালেক যেদিন আহত হয় সেদিনই ছাত্র সংঘের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। সে মামলায় তোফায়েল আহমেদ আসামি ছিলেন না। সে সময়ের পত্র-পত্রিকায় কোথাও হামলাকারী হিসেবে তোফায়েল আহমেদের নাম নেই। অথচ আজ ৫৭ বছর পর এসে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা দাবি করছে, তোফায়েল আহমেদ নাকি মালেকের খুনি!

পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, তোফায়েল আহমেদ হাফ হাতা শার্ট পরে বক্তৃতা করছেন, অথচ জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা পাঞ্জাবি পরা এক লোকের ছবি দেখিয়ে বলছে, এই দেখো, তোফায়েল আহমেদ মালেককে মারছে!

বি. দ্র. পেপার কাটিংগুলোর লেখা ভালোভাবে বোঝা যাচ্ছে না। পেপারগুলোর লিংক দিয়েছি। লিংকে ক্লিক করলে পেপারগুলো পিডিএফ পড়তে পারবেন।

Visited 5 times, 1 visit(s) today