বিশ্বকাপ শুরু হতে বাকি মাত্র এক মাস, অথচ চীন, ভারত, বাংলাদেশ থেকে শুরু করে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড—ফুটবল-পাগল এশিয়ার বিশাল এক অংশে এখনো ইতিহাসের বৃহত্তম এই আসরের সম্প্রচার স্বত্ব নিশ্চিত হয়নি।
অসময়ে খেলা হওয়ার বিষয়টিই অন্যতম কারণ, যার ফলে কোটি কোটি ভক্ত সোফায় বসে খেলা দেখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
ফুটবলের এই মহোৎসব যৌথভাবে আয়োজন করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। আগামী ১১ জুন মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে এটি শুরু হবে।
বেজিং এবং সাংহাইয়ের ভক্তদের জন্য উদ্বোধনী ম্যাচ এবং ফাইনাল—উভয়ই শুরু হবে ভোর ৩:০০ টায়। নয়াদিল্লিতে সেই সময়টি হবে রাত ১২:৩০ মিনিট, যদিও কিছু ম্যাচ এশিয়ায় সুবিধাজনক সময়ে দেখা যাবে।
বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘রেডিফিউশন’-এর চেয়ারম্যান সন্দীপ গোয়েল এএফপি-কে জানান যে, ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ভারতীয় সম্প্রচারকারীদের মধ্যে কিছু আলোচনার বিষয়ে তিনি অবগত আছেন।
গোয়েল বলেন, ‘প্রথম সমস্যাটি হলো ম্যাচের সময় নিয়ে।’
‘বড় এবং ভালো ম্যাচগুলো রাত ১২:৩০ বা ভোর ৩:৩০ মিনিটে। কিছু ম্যাচ সকাল ৬:৩০ মিনিটে। কট্টর ফুটবল ভক্ত ছাড়া ভারতে দর্শকসংখ্যা কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
‘ফলে চ্যানেলগুলোর জন্য অর্থ উপার্জনের সুযোগ ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে।’
গোয়েল জানান যে, ভারতের বৃহত্তম মিডিয়া গ্রুপ ‘জিওস্টার’ স্বত্বের জন্য ২ কোটি ডলার প্রস্তাব করেছে। তিনি আরও বলেন, সনি কোনো প্রস্তাব দেয়নি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, ফিফা শুরুতে ২০২৬ ও ২০৩০ বিশ্বকাপের স্বত্বের জন্য ১০ কোটি ডলার চেয়েছিল।
গোয়েল যোগ করেন, ‘ফিফা যা চাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি তার চেয়ে অনেক কম দামে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীদের সংশ্লিষ্টতা
ভারতের মতো চীনও এখন পর্যন্ত ৪৮টি দল ও ১০৪টি ম্যাচের এই টুর্নামেন্টের জন্য কোনো চুক্তির ঘোষণা দেয়নি।
এই দুই দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৩০০ কোটি এবং কোনো দেশই বিশ্বকাপে খেলছে না, তবুও ফুটবলের প্রতি আগ্রহ প্রবল, বিশেষ করে চীনে।
ফিফার তথ্য অনুসারে, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল ও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে মোট দর্শক ঘণ্টার ৪৯.৮ শতাংশই ছিল চীনের।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এই সপ্তাহে এ বিষয়ে সরব হয়েছে। ‘গ্লোবাল টাইমস’ ২০১৫ সালের একটি নিয়ন্ত্রক বিজ্ঞপ্তির কথা উল্লেখ করে জানিয়েছে যে, জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা ‘সিসিটিভি’-র কাছে চীনে বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে আলোচনা ও কেনার একচ্ছত্র অধিকার রয়েছে।
‘গ্লোবাল টাইমস’ বলেছে, ‘ঐতিহাসিকভাবে সিসিটিভি অনেক আগেই বিশ্বকাপের স্বত্ব নিশ্চিত করে থাকে।’
‘আগের আসরগুলোতে ব্যাপক প্রচার এবং বিজ্ঞাপনের সুযোগ দেওয়ার জন্য সাধারণত অনেক আগেই চুক্তি সম্পন্ন করা হতো।’
থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়া কখনো বিশ্বকাপে পৌঁছাতে পারেনি, কিন্তু দুই দেশেই ফুটবল অত্যন্ত জনপ্রিয়—অথচ এখন পর্যন্ত কোনো দেশই চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
থাইল্যান্ডের জাতীয় সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ কমিশন (এনবিটিসি) গত জুনে বিশ্বকাপকে ‘অবশ্যই দেখাতে হবে’ এমন তালিকা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এর অর্থ হলো, টুর্নামেন্টটি এখন আর ফ্রি-টু-এয়ার টেলিভিশনে দেখানোর বাধ্যবাধকতা নেই।
তবে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মঙ্গলবার ভক্তদের আশ্বস্ত করেছেন যে তারা খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হবেন না।
অনুতিন চার্নভিরাকুল সাংবাদিকদের বলেন, ‘পূর্ববর্তী সরকারগুলো বিশ্বকাপে বিনামূল্যে প্রবেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল এবং আমার প্রশাসনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হওয়া উচিত নয়।’
২০২২ সালের আগের আসরের লাইভ স্বত্ব পেতেও থাইল্যান্ড হিমশিম খেয়েছিল। শেষ মুহূর্তে ফিফার সঙ্গে আনুমানিক ৩ কোটি ৩০ লক্ষ ডলারের একটি চুক্তি চূড়ান্ত করে স্পোর্টস অথরিটি অফ থাইল্যান্ড, যার অর্থায়ন করেছিল এনবিটিসি এবং ট্রু কর্পোরেশনের মতো বেসরকারি অংশীদাররা।
‘চুক্তি হয়েই যাবে’
‘ডিলয়েট এশিয়া প্যাসিফিক’-এর স্পোর্টস বিজনেস লিডার জেমস ওয়ালটন বলেন, এশিয়ায় কোটি কোটি ভক্ত খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হবেন—এমন খবরগুলো অতিরঞ্জিত।
এএফপি-কে পাঠানো এক ইমেইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি চক্রেই কিছু দেশে এমনটা ঘটে।’
‘দেশি সম্প্রচারকারীরা সেরা চুক্তিটি চায় কারণ তাদের এই খরচের সঙ্গে বিজ্ঞাপনের সম্ভাব্য আয় (বেসরকারি চ্যানেল) বা সামাজিক সুবিধা (সরকারি চ্যানেল)-এর ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়।’
‘এদিকে, স্বত্বাধিকারীরা জানেন যে এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের স্বত্ব বিক্রির অনন্য সুযোগ।’
তিনি বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, বেশিরভাগ দেশের জন্য বিশ্বকাপ না দেখানো প্রায় অকল্পনীয়।’
‘তাই কোনো না কোনোভাবে একটি চুক্তি হয়েই যাবে।’
ওয়ালটন আরও যোগ করেন, ‘বাস্তবে এই সব দেশের ভক্তরা অবশ্যই খেলা দেখতে পাবেন কারণ তাদের সরকারগুলো সম্ভাব্য জনরোষের বিষয়টি বুঝতে পারবে।’
‘আর ফিফাও চাইবে তাদের প্রধান ইভেন্টটি যেন সর্বোচ্চ প্রচার পায়, যাতে স্পন্সরদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা যায়, ফুটবলের পরিচিতি বাড়ে এবং জলদস্যুতা (পাইরেসি) রোধ করা যায়।’
বিশ্বকাপ দ্রুত ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে স্বত্ব নিয়ে চিন্তিত কি না—এএফপির এমন প্রশ্নে ফিফা জানায় যে তারা ১৭৫টিরও বেশি দেশের সম্প্রচারকারীদের সাথে চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
তারা বলেছে, ‘২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মিডিয়া স্বত্ব বিক্রির বিষয়ে বাকি কয়েকটি বাজারের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং এই পর্যায়ে তা গোপনীয় রাখা জরুরি।’
