ইরান যুদ্ধের মধ্যেও চীন যেভাবে তেলের সরবরাহ নিরাপদ রাখছে

ইরান যুদ্ধের মধ্যেও চীন যেভাবে তেলের সরবরাহ নিরাপদ রাখছে
শেয়ার করুন

❐ আন্তর্জাতিক ডেস্ক


বিশ্বের সর্ববৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীন দীর্ঘদিন ধরে একটি “দ্বৈত বিমা” কৌশল অনুসরণ করে আসছে — একদিকে সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যময় করা, অন্যদিকে বিশাল কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দূরদর্শী পরিকল্পনাই চীনকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করেছে।

২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বিমান অভিযান শুরু করলে ইরান পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করে। এই প্রণালীর মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ সামুদ্রিক তেল বাণিজ্য এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবহন করা হয়।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা এটিকে “বৈশ্বিক তেল বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্ন” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রণালী বন্ধের পরপরই ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১০ থেকে ১৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮০ থেকে ৮২ ডলারে পৌঁছায়, এবং পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

চীন তার মোট তেলের চাহিদার অন্তত ৭০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে প্রতিদিন ৫৩.৫ লাখ ব্যারেল তেল চীনে পৌঁছাত। পারস্য উপসাগরের ছয়টি দেশ গত বছর চীনের মোট আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ সরবরাহ করেছিল।

কিন্তু প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই প্রবাহ কমে মাত্র ১২.২ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে — এবং সেটা আসছে কেবল ইরান থেকে, কারণ ইরান চীন ও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশের জাহাজকে প্রণালী পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে।

তবে চীন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিকল্প সরবরাহ উৎস খুঁজে নিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মার্চে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি এক বছর আগের তুলনায় ২৫ শতাংশ কমে গেলেও মোট আমদানি মাত্র ২.৮ শতাংশ কমেছে — মোট পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ৯৯.৮ লাখ টন, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ১৭.৭ লাখ ব্যারেল।

২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে রাশিয়া থেকে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি ৪০.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রাজিল থেকে মার্চে রেকর্ড পরিমাণ তেল কেনা হয়েছে, যা ব্রাজিলের মাসিক রপ্তানিকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গেছে। ইন্দোনেশিয়া থেকেও আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এর বেশিরভাগই ছিল পুনরায় রুট করা ইরানি তেল।

তবে পরিস্থিতির সম্পূর্ণ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল এনার্জি পলিসি সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক এরিকা ডাউনস বলেছেন, পারস্য উপসাগর থেকে চীনে তেল পৌঁছাতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে বলে মার্চের আগে প্রণালী বন্ধের প্রভাব পুরোপুরি অনুভূত হয়নি। এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরে প্রবেশকারী বা বের হওয়া জাহাজ আটকাতে শুরু করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।

বৈশ্বিক পণ্য বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, এপ্রিলে চীনের সামুদ্রিক পথে অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রতিদিন ৮৭ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে, যা আগস্ট ২০২২-এর পর সর্বনিম্ন।

তবে চীনের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হলো তার বিশাল তেল মজুদ। ২রা মার্চ পর্যন্ত চীনে ১৩৯ কোটি ব্যারেল তেল মজুদ ছিল, যা ২০২৫ সালের গড় আমদানির হিসাবে ১২০ দিনের সমতুল্য — আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার নির্ধারিত ৯০ দিনের মানদণ্ডকে অনেক ছাড়িয়ে। এই মজুদের একটি বড় অংশ রাশিয়া, ইরান ও ভেনেজুয়েলার মতো নিষেধাজ্ঞাভুক্ত দেশ থেকে সস্তায় কেনা তেল দিয়ে গড়া হয়েছে, যা চীনের ছোট স্বতন্ত্র “টিপট” শোধনাগারগুলো বছরের পর বছর ধরে আমদানি করে আসছিল।

এছাড়া ভাসমান জাহাজে এশিয়ায় ৪ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেরও বেশি ইরানি তেল মজুদ রয়েছে এবং চীনের দালিয়ান ও ঝৌশান বন্দরে বন্ডেড স্টোরেজেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মজুদ আছে।

ডাউনস বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলেও চীন তার মজুদ থেকে প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পারবে।

এই সংকটের জন্য চীনের প্রস্তুতি হঠাৎ করে নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে সুচিন্তিত পরিকল্পনার ফল। চীন ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো নিট তেল আমদানিকারক দেশ হয়ে ওঠে এবং তারপর থেকে আমদানি নির্ভরতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ২০০০-এর দশকের গোড়ার দিকে কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুদ গড়ে তোলা নিয়ে দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক শুরু হয়।

২০১২ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ১৮তম জাতীয় কংগ্রেসে জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

২০২১ সালে একটি তেলক্ষেত্র পরিদর্শনে রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ঘোষণা করেন যে চীন তার জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি “নিজের হাতে” নেবে। চীনে পাঁচটি পেট্রোলিয়াম বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলো মূলত ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রতি বছর হাজার হাজার বিশেষজ্ঞ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সামগ্রিক প্রস্তুতির ফলে চীন বেশিরভাগ এশিয়ার দেশের তুলনায় এই জ্বালানি সংকটে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে, যা চীনের আর্থিক বাজারে তুলনামূলক মৃদু প্রভাবেও প্রতিফলিত হয়েছে। তবে সতর্কতাও রয়েছে — সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে চীনকে কৌশলগত মজুদ ব্যবহার করতে এবং স্বতন্ত্র শোধনাগারগুলোকে ভর্তুকি দিতে বাধ্য হতে পারে।

Visited 4 times, 1 visit(s) today