‘বিদ্যুতের আগে চাই খুঁটি’ থেকে ‘ঢাকায় ৪০টি খেলার মাঠ’: তারেকের প্রতিশ্রুতি আগের মতোই আছে!

‘বিদ্যুতের আগে চাই খুঁটি’ থেকে ‘ঢাকায় ৪০টি খেলার মাঠ’: তারেকের প্রতিশ্রুতি আগের মতোই আছে!
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাস্যরস ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা-১৭ আসনের ইসিবি চত্বরে পথসভায় তিনি ঘোষণা দেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে সমগ্র ঢাকা শহরে অন্তত ৪০টি খেলার মাঠ নির্মাণ করা হবে, যাতে শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করতে পারে এবং নাগরিকরা নিরাপদে হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ, জমির অভাবে ভুগতে থাকা রাজধানীতে এতগুলো মাঠের জন্য জায়গা কোথায়—এ প্রশ্ন তুলে নেটিজেনরা মিম, কার্টুন ও ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট ছড়িয়ে দিয়েছেন।

এটি তারেক রহমানের প্রথম অবাস্তব প্রতিশ্রুতি নয়। সমালোচকরা বলছেন, তিনি প্রায়ই পপুলিস্ট ও ভোটার-তোষণমূলক ঘোষণা দেন, যা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে অথবা ইতিমধ্যে চলমান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ:

৫ বছরে ৫০ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা হিসাব করে দেখিয়েছেন, এতে প্রতিদিন লাখ লাখ গাছ রোপণ করতে হবে—যা বাস্তবায়নের দিক থেকে অসম্ভব।

ফ্যামিলি কার্ড নামে নতুন সামাজিক সহায়তা কার্ডের ধারণা উপস্থাপন করেছেন, যা ৪ কোটি পরিবারকে মাসিক ভাতা ও খাদ্যসামগ্রী দেবে। কিন্তু বিগত সরকারের ভিজিএফ কার্ড, ওপেন মার্কেট সেলসহ বিভিন্ন সহায়তা প্রকল্প ইতিমধ্যে চালু থাকা সত্ত্বেও এটাকে ‘ইউনিক’ বলে প্রচার করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ শাসনামলে দেশের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের ১ কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর আওতায় ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে বা বিনামূল্যে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিতরণ করা হয়। টিসিবি ও ওএমএস (OMS) কর্মসূচির মাধ্যমে এই ব্যাপক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এটি আওয়ামীলীগ সরকারের অন্যতম বৃহত্তম খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে পরিচিতি পায়।

কুমিল্লায় গিয়ে ইপিজেড (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) করার ঘোষণা দিয়েছেন, অথচ কুমিল্লায় ইতিমধ্যে একটি সফল ইপিজেড রয়েছে। নীলফামারীতে নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যেখানে ইতিমধ্যে একটি মেডিকেল কলেজ চালু আছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচকরা মনে করেন, তারেক রহমানের এসব বক্তব্য জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য বলা হচ্ছে। বিগত ১৭ বছরে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি (৩,৫০০ মেগাওয়াট থেকে ২৫,০০০+ মেগাওয়াট), পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনাসহ অসংখ্য প্রকল্পের পরও তিনি দেশের বাস্তব অগ্রগতি সম্পর্কে অজ্ঞ বলে মনে হয়।

অনেকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন তার অতীতের বক্তব্যগুলো। বিএনপি সরকারের আমলে বিদ্যুতায়নের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনার আগে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌছে দেয়ার জন্য প্রথমে খুঁটি (বৈদ্যুতিক খম্বা) লাগানোর পরিকল্পনা, এখনো রাজনৈতিক মহলে হাসির খোরাক। লোডশেডিং নিয়ে অভিযোগের জবাবে তিনি বলেছিলেন, “আপনি একইসাথে শপিং মলে বিদ্যুৎ চাইবেন আবার বাসাতেও বিদ্যুৎ চাইবেন, এটা কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব না।”

আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছিলেন, কিশোর বয়সে তার বাবা জিয়াউর রহমান একটি স্পেস শাটল নিয়ে এসে বলেছিলেন, একদিন বাংলাদেশও স্পেসে রকেট পাঠাবে—যখন দেশের বিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল মাত্র সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট, বাজেট ৪৪ হাজার কোটি টাকা এবং অর্থনীতি বৈদেশিক অনুদান-দানের ওপর নির্ভরশীল।

সমালোচকরা বলছেন, ২০-২৫ বছর আগের মতোই বাংলাদেশের উন্নয়ন আর প্রগতি নিয়ে তারেক রহমানের কোনো সুস্পষ্ট ভিশন নেই। বিদেশে থেকেও তার চিন্তাধারা ও পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আসেনি, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন আর অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি একবারেই অজ্ঞ। ভোটের মাঠে লাইক-ভিউ সর্বস্ব এসব কল্পনাপ্রসূত প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের তুষ্ট করার চেষ্টা চলছে, যা ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে বা অবাস্তব—এমন কোনো নতুন ধারণা বা বাস্তবসম্মত ভিশন তিনি জনমানুষের কাছে তুলে ধরতে ব্যার্থ হয়েছেন, যা বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটাতে পারে।

আসন্ন নির্বাচনে (১২ ফেব্রুয়ারি) এসব প্রতিশ্রুতির প্রভাব কতটা পড়বে, তা ভোটাররাই নির্ধারণ করবেন।

Visited 16 times, 1 visit(s) today