নিজস্ব প্রতিবেদক
আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির আলোচনায় বহুল ব্যবহৃত কিন্তু বিতর্কিত একটি শব্দ হলো “ইকোনমিক হিটম্যান”। মার্কিন লেখক জন পারকিনস তাঁর বহুল আলোচিত বইয়ে এ শব্দটি ব্যবহার করে দাবি করেছিলেন, উন্নয়ন ঋণ, নীতি–পরামর্শ ও করপোরেট চুক্তির আড়ালে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণনির্ভরতা ও কৌশলগত নির্ভরশীলতার জালে আবদ্ধ করা হয়। “ইকোনমিক হিটম্যান” সেই উদ্দেশ্যে উন্নত দেশ বা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির হয়ে “মাৎসায়ন” এর কাজকে সহজতর করে থাকেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দুজন শীর্ষ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকের কর্মকাণ্ড ঘিরে অনেকে এই ধারণার সঙ্গে মিল খুঁজে দেখছেন। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের অভিযোগ, লুৎফে সিদ্দিকী ও চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের কিছু পদক্ষেপ বিদেশী করপোরেট ও আর্থিক স্বার্থের পক্ষে বেশি কাজ করছে, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকার ৪ সেপ্টেম্বর লুৎফে সিদ্দিকীকে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত এবং ১২ সেপ্টেম্বর আশিক চৌধুরীকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। ঘোষিত দায়িত্ব অনুযায়ী লুৎফে সিদ্দিকীর কাজ ছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করা এবং আশিক চৌধুরীর দায়িত্ব ছিল বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। তবে সমালোচকদের দাবি, কাঠামোগত সংস্কারের বদলে তাদের তৎপরতা বেশি দৃশ্যমান হয়েছে বড় অঙ্কের সরকারি ক্রয়, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো সংশ্লিষ্ট চুক্তিতে।
চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে লুৎফে সিদ্দিকীর সক্রিয় ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) ও বে-টার্মিনালে বিদেশী অপারেটর যুক্ত করার বিষয়ে তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন্দর–সংশ্লিষ্ট কিছু পর্যবেক্ষক। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরভিত্তিক পোর্ট অপারেটর পিএসএ ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে আলোচনায় তাঁর পেশাগত নেটওয়ার্ক প্রভাব ফেলছে—এমন অভিযোগও শোনা যায়। যদিও সরকারি মহল বলছে, আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর আনার চেষ্টা দেশের বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতেই করা হচ্ছে।
সরকারি কেনাকাটায় সিঙ্গাপুরভিত্তিক সরবরাহকারীদের সম্পৃক্ততা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। খাদ্যশস্য ও জ্বালানি আমদানির কিছু সিদ্ধান্তে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, উৎপাদক দেশ থেকে সরাসরি কেনার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ক্রয় জাতীয় স্বার্থে কতটা যৌক্তিক—তা পর্যালোচনা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা ও বহুমুখী সরবরাহ চেইন তৈরি করাই ছিল এসব সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য।
লুৎফে সিদ্দিকীর আরেকটি আলোচিত ভূমিকা ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) রোডম্যাপ বাস্তবায়ন–সংক্রান্ত আলোচনায়। শ্রম আইন সংশোধনের প্রক্রিয়ায় তাঁর সক্রিয়তা শিল্পমহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। উদ্যোক্তাদের একাংশ মনে করেন, কিছু পরিবর্তন উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে, অন্যদিকে শ্রম অধিকারকর্মীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হওয়ার জন্য এসব সংশোধন প্রয়োজন ছিল।
অন্যদিকে আশিক চৌধুরীর কর্মকাণ্ড নিয়েও বিতর্ক কম নয়। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি বন্দর ব্যবস্থাপনা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বৃহৎ অবকাঠামো বিনিয়োগে দ্রুত অগ্রগতির পক্ষে অবস্থান নেন। পিসিটি ও নিউমুরিং টার্মিনালে বিদেশী অপারেটর যুক্ত করার প্রক্রিয়া, মহেশখালী–মাতারবাড়ী অঞ্চলে শিল্পায়ন পরিকল্পনা এবং বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়ননির্ভর প্রকল্পগুলোয় তাঁর সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের তুলনায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন।
এছাড়া একই সঙ্গে বিডা, বেজা, পিপিপি কর্তৃপক্ষ ও মহেশখালী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো সংস্থায় প্রভাবশালী ভূমিকা রাখায় আশিক চৌধুরীর হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটছে—এমন আশঙ্কাও ব্যক্ত করেছেন কিছু বিশ্লেষক। তাদের মতে, বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনে সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা হলেও কৌশলগত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা জরুরি।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগ থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজের ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টি ছিল কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কারের বড় সুযোগ, কিন্তু বিনিয়োগ পরিবেশ, বাণিজ্য কাঠামো ও এলডিসি উত্তরণ–পরবর্তী প্রস্তুতিতে সমন্বিত কর্মসূচি প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।
সব মিলিয়ে লুৎফে সিদ্দিকী ও আশিক চৌধুরীর ভূমিকা নিয়ে জনপরিসরে দুটি বিপরীত বয়ান স্পষ্ট। একপক্ষ তাদের কার্যক্রমকে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক কূটনীতি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের বাস্তবসম্মত উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। অন্যপক্ষের আশঙ্কা, এসব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে কৌশলগত খাতে বিদেশী প্রভাব বাড়তে পারে। ফলে “ইকোনমিক হিটম্যান” তত্ত্বের সঙ্গে তুলনা টানা হলেও বিষয়টি এখনো বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, এবং চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ভর করবে এসব সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের ওপর।
