নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের নির্বাসিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বিবিসির সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) তাঁর বিরুদ্ধে চলমান বিচারকে ‘farce’ বা ‘প্রহসন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি বলেছেন, এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ যা ‘পূর্বনির্ধারিত দোষী সাব্যস্ততার জন্য পরিচালিত হচ্ছে।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে বিক্ষোভের সময় শিক্ষার্থীদের সাথে যুক্ত রাজনৈতিক দল, উগ্রবাদী, মৌলবাদীদের সাথে শেখ হাসিনার সরকারের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ নিহত হয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে ভারতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনা এই সাক্ষাৎকারে নিজেকে দৃঢ়ভাবে নির্দোষ বলে উপস্থাপন করেছেন।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, “এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি এবং এ কারণে যাওয়ায় অনেক প্রাণ ঝরেছে। কিন্তু আমি কখনো নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিইনি।”
তিনি ট্রাইব্যুনালে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “ আমি কখনই নিরাপত্তা বাহিনীকে আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেইনি, এই অভিযোগ আমি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করছি।”
তাঁর বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে এই বিচার অ্যাবসেন্টিয়ায় বা উনার অনুপস্থিতিতে পরিচালিত চলছে এবং ১৭ই নভেম্বর বিচারের রায় ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।
শেখ হাসিনা এই বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে অভিহিত করে বলেন, এতে তাঁর নিজের আইনজীবী নিয়োগের সুযোগই পাননি।
তিনি বলেন, “আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে পারছি না, আমার নিজের মনোনীত আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি।”
তিনি আরও যোগ করেন, তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দমন করার চেষ্টায় এই পদক্ষেপ নিয়েছে। আওয়ামী লীগকে ইতোমধ্যে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে, “ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁরই অনুপস্থিতিতে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত ‘গণহত্যা”র অভিযোগ তিনি অস্বীকার করছেন, বরং বিচারকে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছেন।”
জুলাই-আগস্টে বিক্ষোভরত রাজনৈতিক দল-উগ্রবাদী-জঙ্গিদের সমন্বিত আক্রমণের ১৫ মাস পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার উপস্থিতি লক্ষণীয়। তিনি বিবিসি ছাড়াও রয়টার্স, এএফপি, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কথা বলেছেন।
এসব সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর সরকারের পতনকে, ‘সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন, যা শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনকে পুঁজি করার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে।
তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূসকে এর নেপথ্যের প্রধান কুশীলব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যিনি বাংলাদেশের চরমপন্থী এবং ইসলামপন্থীদের সমর্থন পেয়েছেন ইতিমধ্যে।
এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ইউনূসের সরকার দ্বারা পরিচালিত বিচারে ফলাফল ‘পূর্বনির্ধারিত’।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক নয়, এমনকি ট্রাইব্যুনালও নয়।”
তিনি আরও জানান, তিনি আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে, এমনকি হেগ-এর আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (আইসিসি) বিচারের জন্য প্রস্তুত, কিন্তু ইউনূস এমন নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলছেন কারণ তাতে তিনি (শেখ হাসিনা) নির্দোষ প্রমাণিত হবেন।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে শেখ হাসিনা জানান, তাঁর দলকে নিষিদ্ধ করলে ২০২৬ সালের নির্বাচন অসম্পূর্ণ হবে এবং কোটি কোটি সমর্থক ভোট বর্জন করবেন।
“আমরা অন্য দলকে সমর্থন করার জন্য আওয়ামী লীগের ভোটারদের বলছি না। আমরা এখনও আশা করছি যে সাধারণ মানুষ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে দেশের সার্বিক পরিস্থতির কথা বিবেচনা করবে এবং আমরা নিজেরাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারব,” তিনি রয়টার্সকে বলেন।
তিনি যোগ করেন, “আওয়ামী লীগের কোটি কোটি মানুষের সমর্থন রয়েছে। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়া হলে নির্বাচন ‘স্বাধীন, নিরপেক্ষ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হবে না।
কেন হঠাৎ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু শেখ হাসিনা?
সাম্প্রতিক সপ্তাহে শেখ হাসিনার এই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারগুলো ড. ইউনূসের সরকারকে ব্যাপক অস্বস্থিতে ফেলে দিয়েছে। এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার নিয়মিত বক্তব্যের প্রচারের কারণে ঢাকাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। যার ফলে ভারতীয় কূটনীতিককে তলব করে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার বন্ধের অনুরোধও জানিয়েছে ইউনূস সরকার।
যদিও বিশ্বনন্দিত বহুজাতিক গণমাধ্যম এএফপি, রয়টার্স, বিবিসি, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট বা কাতার ভিত্তিক আল জাজিরা ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পাঠানোর তথ্য মেলেনি।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা এবং সমর্থকদের সম্ভাব্য ভোট বর্জনের হুমকি দেশের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হচ্ছে। বিভিন্ন গণমধ্যমে শেখ হাসিনার এই উপস্থিতি, বিশ্বের সামনে তাঁর অবস্থান এবং ইউনূস সরকারের বক্তব্যের বিপরীত চিত্র তুলে ধরা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
তাঁর বক্তব্য একদিকে যেমন গত বছরের জুলাই-আগস্টের অনেক অজানা অধ্যায়কে দেশবাসীসহ বিশ্ববাসীর নজরে আনছে, ইউনূস সরকারের ছড়ানো অপতথ্যকে খণ্ডন করছে, তেমনি তাঁর প্রকাশ্য উপস্থিতি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে ইউনূস সরকারের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসাবে দেখা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে।
