নিজস্ব প্রতিবেদক।
কাঠমুণ্ডু, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই কোটা আন্দোলন যেভাবে আদালত কোটা সংস্কার মেনে নেয়ার পরেও, “নতুন ইস্যুযোগে” সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়, তেমনি নেপালে সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা ইস্যু থেকে বেরিয়ে এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেন জি (জেনারেশন জি) যুবকদের নেতৃত্বাধীন প্রতিবাদও সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করছে।
নেপালের এই আন্দোলনে কি বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক দল এবং আন্তর্জাতিক শক্তির ষড়যন্ত্রের প্রভাব দেখা যাচ্ছে? বিশ্লেষকরা এই প্রশ্ন তুলছেন, যদিও প্রমাণিত তথ্য এখনও সীমিত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, সুপ্রিম কোর্টের ৩০% কোটা পুনর্বহালের রায়ের পর শিক্ষার্থীরা প্রথমে কোটা সংস্কার দাবি করে রাস্তায় নামে। কিন্তু আদালতের রায়ের পরও সরকারের দমনমূলক নীতি, পুলিশের গুলি এবং ছাত্রলীগের হামলায় আন্দোলন নতুন অজুহাতে (দুর্নীতি, বেকারত্ব, স্বৈরাচার) ছড়িয়ে পড়ে। এতে ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
এখন নেপালে অনুরূপ দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে। ৪ সেপ্টেম্বর সরকার ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউবসহ) নিষিদ্ধ করে, যা সাইবার অপরাধ এবং দুর্নীতি রোধের নামে করা হয়। এর ফলে যুবকরা ‘জেন জি প্রতিবাদ’ শুরু করে, যা শুধু নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে নয়, বরং দুর্নীতি, নেপোটিজম (রাজনৈতিক নেতাদের সন্তানদের বিলাসিতা) এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতার বিরুদ্ধে।
৮ সেপ্টেম্বর কাঠমান্ডুর সংসদ ভবনের সামনে হাজার হাজার যুবক জড়ো হয়, যাদের অনেকে স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পরিধান করে। পুলিশ জলকামান, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট এবং লাইভ গুলি ব্যবহার করে ভিড় ছত্রভঙ্গ করলে কমপক্ষে ১৯ জন নিহত এবং ৩০০-এর বেশি আহত হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুসারে, এর মধ্যে একজন ১২ বছরের শিশু রয়েছে।
সরকার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে এবং গৃহমন্ত্রী রামেশ লেখক পদত্যাগ করেন, কিন্তু প্রতিবাদ অব্যাহত। মঙ্গলবার কারফিউ জারি হলেও কাঠমান্ডু, পোখারা, বিরাটনগরসহ শহরগুলোতে নতুন সংঘর্ষ হয়। প্রতিবাদকারীরা প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলির পদত্যাগ দাবি করছে এবং তার বাসভবন পোড়ানোর চেষ্টা করেছে।
বিরোধী দল নেপালি কংগ্রেসের নেতা শের বাহাদুর দেবুর বাড়িতে ভাঙচুর হয়েছে। সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন এবং নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু যুবকরা বলছে, “দুর্নীতি বন্ধ করুন, সোশ্যাল মিডিয়া নয়।” এখানে বাংলাদেশের সাথে মিল রয়েছে: দুটোই যুবক-নেতৃত্বাধীন, একটি নির্দিষ্ট ইস্যু (কোটা বনাম সোশ্যাল মিডিয়া ব্যান) থেকে দুর্নীতি এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপান্তরিত। দুটোতেই পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে ব্যাপক হতাহত, এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ‘জেন জি বিপ্লব’ হিসেবে প্রচার।
জাতিসংঘ মানবাধিকার অফিস এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, “অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।” ভারত সীমান্তে সতর্কতা জারি করে বলেছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশগুলো হতাহতের নিন্দা করে তদন্ত দাবি করেছে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের অভিযোগ? প্রধানমন্ত্রী ওলি বলেছেন, “বিভিন্ন স্বার্থগ্রস্ত গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের ফলে সহিংসতা হয়েছে।”
এটি বাংলাদেশে আওয়ামীলীগের ‘বিদেশি শক্তি’ অভিযোগের অনুরূপ। কিছু সূত্রে বলা হচ্ছে, বিরোধী দল নেপালি কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ এতে প্রভাব ফেলেছে।
আন্তর্জাতিকভাবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় টিকটক ভিডিওগুলো (রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসিতা দেখানো) ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়ার অনুরূপ ক্যাম্পেইন থেকে অনুপ্রাণিত, যা বাংলাদেশের আন্দোলনের মতো।
তবে প্রতিবাদকারীরা দাবি করছে, “কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে আমাদের যোগাযোগ নেই; এটি যুবকদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন।” একজন প্রতিবাদকারী ইক্ষমা তুমরোক (২০) বলেছেন, “আমরা শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ছি, কোনো পার্টির প্রভাবে নয়।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেপালের অস্থির রাজনীতি (২০০৮ সাল থেকে ১৪টি সরকার) এবং অর্থনৈতিক সংকট (প্রতি বছর ১,৩০০ ডলার আয়) আন্দোলনকে জ্বালানি সরবরাহ করছে। বাংলাদেশের মতো এখানেও যদি আন্তোর্জাতিক ক্রিড়ানকরা প্রভাব চালিয়ে যায়, তাহলে ওলি সরকারের পতন হতে পারে।
