সুবীর ভৌমিক
বাংলাদেশ, যে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নারী ক্ষমতায়নের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত ছিল, সেখানে সম্প্রতি নারীদের বিরুদ্ধে চরমপন্থী ইসলামপন্থীদের সহিংস তৎপরতা বেড়ে চলেছে। নারীদের ফুটবল খেলা থেকে শুরু করে জনসম্মুখে তাদের উপস্থিতির বিরুদ্ধেও চালানো হচ্ছে আক্রমণ। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় নারীদের খেলাধুলা ও বিনোদন জগতে অংশগ্রহণ বন্ধ করার জন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো সহিংস আন্দোলন চালিয়েছে।
নারীদের ফুটবল বন্ধের জন্য সহিংসতা
গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জয়পুরহাটে একটি নারীদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে স্থানীয় মাদ্রাসার ছাত্রদের নেতৃত্বে একদল চরমপন্থী ইসলামী গোষ্ঠী সেখানে হামলা চালিয়ে খেলা পণ্ড করে দেয়। তারা খেলার মাঠ ভাঙচুর করে এবং টিকিট কেটে খেলা দেখতে আসা দর্শকদেরও তাড়িয়ে দেয়।
একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে দিনাজপুরে, যেখানে নারীদের আরেকটি ফুটবল ম্যাচ ধর্মীয় মৌলবাদীদের বিক্ষোভের কারণে বাতিল করতে বাধ্য হয় আয়োজকরা। প্রতিবাদকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে মাঠে উপস্থিত হয় এবং খেলোয়াড়দের মাঠে প্রবেশে বাধা দেয়।
জয়পুরহাটের এক স্থানীয় মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “নারীদের ফুটবল ইসলামবিরোধী, এবং আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব হলো যেকোনো অনৈসলামিক কার্যকলাপ বন্ধ করা।”
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বিএফএফ) এসব ঘটনার কঠোর নিন্দা জানিয়ে বলেছে, “ফুটবল সবার জন্য, এবং নারীদের সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে খেলাধুলায় অংশগ্রহণের।” তারা আরও উল্লেখ করে যে, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং মরক্কোর মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেও নারীদের ফুটবল দল রয়েছে এবং তারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
সরকার ও সমাজের নীরবতা
বিএফএফ নারীদের ফুটবল রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিলেও বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়টিতে নীরব রয়েছে, যা নারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।
২০২২ সালে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দল প্রথমবারের মতো সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সাফ) চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিল, যা নারী খেলোয়াড়দের জন্য একটি বিশাল সাফল্য ছিল। গত নভেম্বরে তারা আবারও এই শিরোপা ধরে রাখে, যা নারীদের খেলাধুলার প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি করেছিল। কিন্তু মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে, ধর্মীয় মৌলবাদীদের চাপের মুখে নারীদের ফুটবল মাঠ ছেড়ে যেতে হচ্ছে।
প্রবীণ নারী সাংবাদিক ও অধিকারকর্মী মাসুদা ভাট্টি সরকারের এই নীরবতার কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “নারীরা যখন ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজপথে ছিল, তখন তারা প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু এখন তাদের প্রয়োজন নেই বলেই সরকার নিশ্চুপ।”
বিনোদন জগতে নারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা
নারীদের শুধু ফুটবল থেকেই নয়, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র থেকেও দূরে রাখার চেষ্টা চলছে।
গত নভেম্বর মাসে জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী চট্টগ্রামে একটি শোরুম উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে ফিরে যেতে হয়। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম জানায়, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো শোরুম উদ্বোধনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল।
এই ঘটনার পর, জানুয়ারির ২৬ তারিখে চিত্রনায়িকা পরীমনিকে টাঙ্গাইলে একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর উদ্বোধন থেকে বাধা দেওয়া হয়। এর দু’দিন পর, অভিনেত্রী অপু বিশ্বাসকে ঢাকায় একটি রেস্তোরাঁ উদ্বোধন করতে দেওয়া হয়নি, কারণ স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা হুমকি দিয়েছিলেন যে, যদি তিনি উদ্বোধন করেন, তাহলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।
পরীমনি এ ঘটনার প্রতিবাদে সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “ধর্মের নামে নারীদের উপর এমন জুলুম কেন? আমি কি আমার নিজের দেশে নিরাপদে কাজ করতে পারবো না?”
এই প্রতিবাদের পর পরীমনির বিরুদ্ধে পুরনো এক মামলায় নতুন করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। অভিনেত্রী অভিযোগ করেন যে, এটি তাকে চুপ করানোর কৌশল।
নারীদের জন্য এক নতুন সংকট?
এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশে নারী স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নারী অধিকার কর্মী ও আইনজীবী তানিয়া আমির বলেন, “নারীদের ফুটবল খেলা বন্ধ করা কেবল শুরু। এই মৌলবাদীরা এখন শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশও বন্ধ করতে চাইবে।”
প্রবীণ লেখিকা তসলিমা নাসরিন বলেন, “এই হামলাগুলো আসলে ইসলামপন্থী মৌলবাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রশ্রয় দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে।”
বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক মনে করছেন, সরকারের নীরবতা এবং চরমপন্থীদের প্রতি নমনীয় মনোভাব বাংলাদেশকে আরও পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একসময় যে দেশ নারীর ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, সেই দেশ এখন নারীদের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে।
নারীদের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ শুধু ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ওপর হামলা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের বিরুদ্ধেও একটি বড় আঘাত। এখন সময় এসেছে সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীদের প্রতি এই সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর।
